সেনাবাহিনীর সঙ্গে মতভেদ নেতানিয়াহুর

গাজায় চার হাজারের বেশি শিক্ষার্থী হত্যা, নারী-শিশুকে নির্মমভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো কিংবা হাসপাতাল-স্কুল-আশ্রয়কেন্দ্রে লাগাতার আক্রমণ সব মিলিয়ে তেলআবিব প্রশাসন যখন বিশ্ব বিবেকের কাছে ২১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি হত্যার দায়ে অভিযুক্ত, তখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দাদের মতবিরোধের খবর সামনে এসেছে। সূত্রের বরাত দিয়ে ইসরায়েলের গণমাধ্যম বলছে, নিরাপত্তা বাহিনীর তরফে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা নিয়ে পরিকল্পনার তাগিদ দিলেও নেতানিয়াহু এ-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো মতেই কথা বলতে চাইছেন না।

অভিযোগ উঠেছে, যুদ্ধের পর গাজা নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করা নিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর তরফ থেকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আহ্বান জানানো হলেও লিকুদ পার্টির এই নেতা তাতে কোনো ধরনের সাড়া দিচ্ছেন না। বেশ কয়েকবার তাকে এ নিয়ে অনুরোধ করা হয়।

গত মঙ্গলবার রাতে ইসরায়েলি গণমাধ্যম ‘চ্যানেল ১২’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও শিন বেত, প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) চিফ অব স্টাফ এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তিনটি অনুরোধ গেছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে। ‘যুদ্ধ শেষের পরদিন’ গাজাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের সম্ভাব্য পরিকল্পনা প্রণয়ন নিয়ে কথা বলতে বৈঠক আহ্বান করতে বলা হয়। কিন্তু এসব অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তার ভাষ্য ছিল এ রকম, ‘সময় ফুরিয়ে আসছে এবং গাজার ভেতরে এবং বাইরের সক্রিয় প্রাসঙ্গিক পক্ষগুলোকে নিয়ে ইসরায়েল কী পরিকল্পনা গ্রহণ করছে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমেরিকানরা এ-সংক্রান্ত ব্যাখ্যা দাবি করছে।’

গত মঙ্গলবারের এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার আগে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে খবর বের হয়, নেতানিয়াহু এবং তার সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ত গাজায় বর্তমানের ‘ব্যাপক পরিসরের’ আক্রমণ থেকে হামাসের নেতাদের লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে হামলা চালানোর ‘বহুল প্রত্যাশিত’ কৌশলের ওপর নজর দেওয়া নিয়ে কথা বলতে রাজি নন। আবার নেতানিয়াহু সম্ভাব্য জিম্মি মুক্তি নিয়ে মোসাদের পরিকল্পনা-সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনায় গ্যালান্তকে অংশ নিতেও বাধা দিচ্ছেন নেতানিয়াহু।

অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, গাজা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরের আলোচনা করতে মাসখানেক আগে বৈঠক আহ্বান হয়েছিল। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বৈঠকটি হতে পারে।

অনেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষক মনে করেন, নেতানিয়াহু গাজা যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা এবং যুদ্ধের পর উপত্যকার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে সময়ক্ষেপণ করছেন। কারণ যুদ্ধ শেষে তার যুদ্ধকালীন জরুরি সরকার ক্ষমতা ছাড়ার চাপে পড়তে যাচ্ছে।

গাজার নিয়ন্ত্রক হামাস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েল উপত্যকার বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালিয়ে কমপক্ষে ১৯৫ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৩২৫ জনের মতো। এর মধ্যে খান ইউনিস এলাকায় আল আমাল সিটি হাসপাতালের কাছে হামলায় ২০ জন নিহত হয়। এখন পর্যন্ত যুুুদ্ধে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছে ২১ হাজার ১১০ ফিলিস্তিনি। এর মধ্যে শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে চার হাজারেরও বেশি।

এরদোয়ান ও নেতানিয়াহুর বাগযুদ্ধ

ইসরায়েলি নৃশংসতা নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেন, গাজায় নেতানিয়াহুর যা করছেন, একই কাজ ইউরোপে অ্যাডলফ হিটলার করেছেন। হিটলার এবং নেতানিয়াহুর মধ্যে কোনো তফাৎ নেই।

ওই বক্তব্যের জবাবে নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ‘এরদোয়ান হলেন সেই ব্যক্তি যিনি কুর্দিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা করেছেন, নিজ দেশের বিরোধী মতকে রুখতে সাংবাদিককে কারাবন্দি করার বিশ্বরেকর্ড করেছেন, তিনি কি না শেষ পর্যন্ত আমাদের নৈতিকতা শেখাচ্ছেন।’