কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) কাজী ওমর সিদ্দিকীর পিএইচডি ডিগ্রির সনদ নথিভুক্তির সুপারিশ ডিগ্রিটির নিরীক্ষণকারী কমিটি করেনি; উপাচার্যের নির্দেশে নথিভুক্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মো. আমিরুল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত অফিসস্মারকের মাধ্যমে বিষয়টি জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা না হলেও উপাচার্যের আস্থাভাজন হওয়ায় সিদ্দিকীর সনদ নথিভুক্ত করা হয়। জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের ডিঙিয়ে সিদ্দিকীকে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর করেন কুবি উপাচার্য ড. এএফএম আবদুল মঈন। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করে তার পিএইচডি সনদ নথিভুক্ত করার বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা।
পরিসংখ্যান বিভাগের প্রধান ড. দুলাল চন্দ্র নন্দী বলেন, ‘এটি ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নয়। এমন প্রীতিরোধে উচ্চশিক্ষার কাঠামো ভেঙে পড়বে ও শিক্ষার মান সংকটে পড়বে।’
জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী ডিগ্রি অর্জনে শিক্ষাছুটি নিয়ে বিদেশে গেলে কাজী ওমর সিদ্দিকীর জায়গায় অন্য কাউকে প্রক্টরশিপ দেওয়া হতো। এ কারণে সিদ্দিকী শিক্ষাছুটির পরিবর্তে বিভিন্ন সময়ে ২২, ২৮ ও ২১ দিন অর্জিত ছুটি নিয়ে ডিগ্রি অর্জনের কাজে মালয়েশিয়ায় থাকেন।
জানা গেছে, ওমর সিদ্দিকী পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য ২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি আবেদন করলে ১১ ফেব্রুয়ারি তাতে অনুমোদন দেওয়া হয়। করোনা মহামারীর সময়ে ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট তিনি মালয়েশিয়ার পুত্রা বিজনেস স্কুলে (পিবিএস) অনলাইনে ক্লাস কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন; ৫ সেপ্টেম্বর কর্তৃপক্ষ শুধু করোনাকালে অনলাইন ক্লাসের অনুমোদন দেয়। কিন্তু এরপরও তিনি অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পিএইচডি করার সময়ে তিনি বিশ^বিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রমে অংশ নেন।
শিক্ষাছুটি না নিয়েও তিনি ২০২২ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ১৫ মে, ২০২৩ সালের ৯ এপ্রিল থেকে ৬ মে এবং একই বছরের ১৩ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর যথাক্রমে ২২, ২৮ ও ২১ দিন মালয়েশিয়ায় অবস্থান করেন। তবে সিন্ডিকেটে উল্লিখিত দুই বছরের ছুটি তিনি পূর্ণ করেননি।
বিশ^বিদ্যালয়ের ৭৬তম সিন্ডিকেট সভার ৪৫ আলোচ্যসূচির সিদ্ধান্তে বলা হয়, যেসব শিক্ষক উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মনোনীত হয়েছেন কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে ভিসাপ্রাপ্তিতে বিলম্ব হচ্ছে তারা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমতিসাপেক্ষে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবেন। তবে অনলাইন ক্লাস শুরুর দিন থেকে নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষাছুটি নিতে হবে।
সিন্ডিকেটের ৮৬তম সভার ৩২ আলোচ্যসূচির সিদ্ধান্তে বলা হয়, যে শিক্ষকরা করোনাকালে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর অনুমতি পেয়েছেন তাদের কমপক্ষে দুই বছর সরাসরি উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে। তা না হলে তাদের অর্জিত ডিগ্রি (পিএইচডি) কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ে গ্রহণযোগ্য হবে না। পরে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করেন সিদ্দিকী।
তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিন্ডিকেটের ৮৭তম সভায় জানানো হয়, শুধু করোনাকালে অনলাইনে পিএইচডি কার্যক্রমের অনুমতিপ্রাপ্ত শিক্ষকদের যাদের কার্যক্রম শেষ হতে দুই বছরের কম সময় লাগবে তারা কোন পর্যায়ে আছেন এবং শেষ করতে কত সময় লাগবে তা উল্লেখ করে সুপারভাইজারের কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র নিয়ে পিএইচডি কার্যক্রমের অবশিষ্টাংশ সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থেকে সম্পন্ন করবেন। তবেই তা রেগুলার ডিগ্রি বিবেচিত হবে। ওমর সিদ্দিকী তার অর্জিত ডিগ্রির মূল কপি রেজিস্ট্রারের দপ্তরে জমা দেননি বলে যাচাই কমিটি (নিরীক্ষণ কমিটি) জানায়।
প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) ওমর সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি নিয়ম মেনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এ বিষয়ে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। সব রেজিস্ট্রার অফিসে জমা আছে।’ তবে রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মো. আমিরুল হক চৌধুরীর সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে যাচাই কমিটির সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘যাচাই একটি অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া। ডিগ্রির সনদ সঠিক কি না, তা দেখাই এ কমিটির কাজ। করোনাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক ছুটি নেননি। তাই এটি অনলাইন নাকি রেগুলার সে প্রশ্ন থাকেই। কমিটি তার অভিমত জানিয়েছে। ডিগ্রি গ্রহণ করা না করার বিষয়টি পুরোপুরি প্রশাসনের এখতিয়ার। উপাচার্য নিজ এখতিয়ারে এটিকে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন।’
সনদ নথিভুক্তকরণ কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, ‘কীভাবে এটি নথিভুক্ত করা হয়েছে তা উপাচার্য বলতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত দিয়েছি। সিন্ডিকেটের ৭৬তম ও ৮৬তম সভার কোনো সিদ্ধান্ত প্রতিপালন না করায় কমিটি সুপারিশ করেছে, তার ডিগ্রি গ্রহণযোগ্য নয়। এ ব্যাপারে উপাচার্য নিজের মতো নির্দেশনা দিয়েছেন।’
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম আবদুল মঈনের সঙ্গে কথা বলতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘তোমাকে আমার অফিসে আসতে হবে।’ প্রতিবেদক তার অফিসে গেলে তিনি বলেন, ‘আমি তোমার এসব নিউজের বক্তব্য দেওয়ার জন্য বসে নেই। আমার অনেক কাজ আছে।’ পরে কল দেওয়া হলেও তিনি সংযোগ কেটে দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘গবেষণা পার্টটাইম হয় না। কোনো শিক্ষককে দেশের বাইরে গিয়ে পিএইচডি করতে হলে তাকে শিক্ষাছুটি নিতে হবে। এজন্য তিনি অর্থও পাবেন।’
তিনি বলেন, ‘পিএইচডি গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান লাভ হয়, ছুটি না নিয়ে পিএইচডি করা সম্ভব নয়। উল্লিখিত শিক্ষক অন্য কোনো উপায়ে পিএইচডি করেছেন কি না, তাও দেখা দরকার। পিএইচডিতে সুপারভাইজারকে রেগুলার ফিডব্যাক দিতে হয়। গবেষণায় শিক্ষার বিষয় থাকে, নির্দেশনার বিষয় থাকে। মালয়েশিয়ার কোনো মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালযয়ে এমনটা করা সম্ভব নয়। আমার মনে হয়, ওই শিক্ষকের থিসিসটা দেখা দরকার, কোন উপায়ে তিনি এটা করেছেন। শিক্ষাছুটি না নিয়ে অল্প সময়ে বাইরের দেশ থেকে পিএইচডি করা সম্ভব নয়।’