হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ততটুকুই যা সে নিয়ত করে।’ -সহিহ বোখারি
হাদিসে বর্ণিত ‘প্রত্যেক কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল’ কথাটি কয়েকটি অর্থ হতে পারে। এক. কাজের শুদ্ধতা নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। দুই. কাজের সওয়াব নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। তিন. কাজের পূর্ণতা নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। চার. কাজ কবুল হওয়া নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।
কনকনে শীতের রাতে ঠান্ডা পানি দিয়ে অজু করে পড়া তাহাজ্জুদ নামাজ আল্লাহর কাছে কবুল হবে না, যদি নিয়ত শুদ্ধ না হয়। কষ্ট করে আদায় করা নামাজ, সারা দিন অভুক্ত থেকে রাখা রোজা, জীবন-যৌবন শেষ করে উপার্জিত অর্থের দেওয়া জাকাত, রাত জেগে করা তেলাওয়াত, মসজিদে করা ইতিকাফ সব আমলই বৃথা, সব কষ্টই ব্যর্থ যদি না নিয়ত পরিশুদ্ধ হয়। যদি না আমল ও ইবাদত-বন্দেগিগুলো হয় ইখলাসযুক্ত, হয় এক আল্লাহর জন্য।
কোনো একটি আমল আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার জন্য সেই আমলটা এক আল্লাহর জন্য হওয়া আবশ্যক। ইখলাসবিহীন (একনিষ্ঠতা ছাড়া) আমল আল্লাহ কবুল করেন না। ইখলাস হচ্ছে, কোনো আমল শুধুমাত্র এক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা। মানুষের সন্তুষ্টি, প্রশংসা, নৈকট্য লাভ বা অন্য কোনো কারণে কোনো কাজ না করা।
শায়খ জুনাইদ (রহ.) বলেন, ইখলাস হচ্ছে আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে থাকা এমন গোপন আমল; যেটা ফেরেশতাও জানে না যে তা লিখে রাখবে, শয়তানও জানে না যে তা নষ্ট করবে, প্রবৃত্তিও জানে না যে তাকে ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেবে।
কোনো কাজ রাসুল (সা.)-এর পূর্ণ সুন্নাহ মোতাবেক হওয়া সত্ত্বেও সেই কাজটা পরিত্যাজ্য হতে পারে, যদি সেটাতে ইখলাস না থাকে। আবার বিপরীতক্রমে যে কাজ পরিপূর্ণ ইখলাসের সঙ্গে করা হয়েছে, তাও আল্লাহ কবুল করবেন না- যদি না সেটা রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ মোতাবেক হয়।
আমলে ইখলাস গুরুত্বপূর্ণ। ইখলাসবিহীন আমল মূল্যহীন। তার মানে এই নয় যে, একনিষ্ঠতা আসা পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি আমল থেকে বিরত থাকবে। বরং সে আমল চালিয়ে যাবে, পাশাপাশি ইখলাস অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যেতে হবে।
ইখলাসের বিপরীত বিষয় হচ্ছে- রিয়া (লৌকিকতা)। ইখলাস যেমন আমল কবুল হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, তেমনি রিয়াও আমল বিনষ্টকারী একটি উপাদান। রিয়া হচ্ছে, কোনো আমল আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে দেখানোর জন্য বা অন্য কারও সন্তুষ্টি, প্রশংসা বা নৈকট্য লাভের জন্য করা। রিয়া সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা এসেছে কোরআন-হাদিসে।
রিয়াকে বলা হয় ছোট শিরক। রিয়াকারী ব্যক্তি সওয়াব থেকে বঞ্চিত। তার বাহ্যিক আমল যতই সুন্দর হোক তার প্রতিদান সে পাবে না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার আমলে শিরক করে (রিয়া করে), তাকে বলা হবে যার জন্য আমল করেছ তার থেকেই তোমার প্রতিদান নিয়ে নাও।’
রিয়াযুক্ত আমল আল্লাহ কবুল করেন না। যে আমল একইসঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয় সেই আমলও আল্লাহ কবুল করেন না। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি অংশীদার থেকে অমুখাপেক্ষী, অতঃপর যে ব্যক্তি কোনো আমল করল, যাতে সে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করেছে তবে আমি সে আমল থেকে মুক্ত।’ -সহিহ মুসলিম
এমনিতে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা বড় অপরাধ। সেই মানুষই যদি তার রবের সঙ্গে প্রতারণা করে, যিনি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সবকিছুই জানেন- সেই অপরাধের মাত্রা আরও বেশি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
বস্তুত এ কাজটাই রিয়াকারী করছে। সে মানুষের সন্তুষ্টির জন্য কোনো একটা কাজ করছে কিন্তু সে দেখাতে চাচ্ছে সে আল্লাহর সন্তুষ্টি চায়!
তাই আমাদের উচিত, ইখলাসসহ আমল করা, আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি তালাশ করা। অল্প আমলই নাজাতের জন্য যথেষ্ট হতে পারে- যদি তা ইখলাসের সঙ্গে করা হয়। আবার উহুদ পাহাড় পরিমাণ আমলও বৃথা যেতে পারে, যদি তা রিয়াযুক্ত হয়। তাইতো হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইখলাসের সঙ্গে ইবাদত করো, অল্প আমলই (নাজাতের) জন্য যথেষ্ট হবে।’