হজ ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে মহানবী (সা.) বলেন, ‘পাঁচটি স্তম্ভের ওপর ইসলামের ভিত্তি : শাহাদত বা আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুলÑ এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া, নামাজ কায়েম করা, জাকাত আদায় করা, রমজানের রোজা রাখা এবং সামর্থ্য থাকলে বায়তুল্লাহর হজ করা।’ (সহিহ বুখারি) সব মুমিন মুসলমানের হজ করার ইচ্ছা থাকলেও কারও আর্থিক সীমাবদ্ধতা, কারও শারীরিক অসুস্থতা, আবার কারও সামনে থাকে নানা প্রতিবন্ধকতা। তবে মহান আল্লাহর রহমত এতটাই বিস্তৃত যে, হজে যেতে না পারলেও কিছু বিশেষ কাজ বা আমলের মাধ্যমে মুমিন বান্দা হজ ও ওমরাহর সমতুল্য সওয়াব লাভ করতে পারেন। মহানবী (সা.) তার উম্মতকে এমন কিছু সহজ ও মহৎ আমলের কথা জানিয়েছেন, যেগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ইবাদতে পরিণত করে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথ সুগম করে। হাদিসের আলোকে তেমন কয়েকটি আমল উল্লেখ করা হলো।
সাহাবি আবু উমামা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে ফরজ নামাজ আদায় করল, সে যেন হজ করে এলো। আর যে ব্যক্তি নফল নামাজ আদায় করতে মসজিদে গমন করল, সে যেন ওমরাহ করে এলো।’ (তাবারানি)
এটা অনেক বড় সওয়াবের কাজ। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মসজিদে গেল কোনো ভালো কথা শেখা বা শেখানোর উদ্দেশ্যে, সে পরিপূর্ণরূপে হজ আদায়কারী ব্যক্তির মতো সওয়াব লাভ করবে।’ (মাজমাউজ জাওয়াইদ)
আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জামাতের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করল, তারপর সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে বসে আল্লাহর জিকির করল, এরপর দুই রাকাত নামাজ আদায় করল, সে ব্যক্তি হজ ও ওমরাহর সওয়াব নিয়ে ফিরল।’ (সুনানে তিরমিজি)
আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, জনৈক ব্যক্তি নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে বলল, আমি জিহাদে অংশ নিতে চাই, কিন্তু আমার সেই সামর্থ্য ও সক্ষমতা নেই। মহানবী (সা.) প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার মাতা-পিতার কেউ কি জীবিত আছেন? লোকটি বলল, আমার মা জীবিত। প্রত্যুত্তরে নবীজি (সা.) বললেন, তাহলে মায়ের সেবা করে আল্লাহর কাছে জিহাদে যেতে না পারার অপারগতা বা ওজর পেশ করো। এভাবে যদি করতে পারো এবং তোমার মা সন্তুষ্ট থাকেন, তবে তুমি হজ, ওমরাহ ও জিহাদ-সংগ্রামের সওয়াব পেয়ে যাবে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং মায়ের সেবা করো।’ (মাজমাউজ জাওয়াইদ)
সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘রমজানে ওমরাহ আদায় করলে আমার সঙ্গে হজ আদায়ের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।’ (সহিহ বুখারি)
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, দরিদ্র লোকেরা রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বলল, সম্পদশালী ব্যক্তিরা বেশি সওয়াব এবং জান্নাত নিয়ে যাচ্ছে! আমরা যেমন নামাজ পড়ি, তারাও পড়ে! আমরা যেমন রোজা রাখি, তারাও রাখে! উপরন্তু তাদের রয়েছে অতিরিক্ত সম্পদ, ফলে তারা হজ করতে পারে, ওমরাহ করতে পারে, জিহাদ-সংগ্রামে অংশ নিতে পারে, দান-সদকাও করতে পারে। নবীজি (সা.) তাদের বললেন, আমি তোমাদের এমন একটি আমল শিখিয়ে দেব যা করতে পারলে তোমরা অগ্রগামীদের স্তরে পৌঁছে যাবে এবং যারা তোমাদের পেছনে তারা তোমাদের স্তরে পৌঁছতে পারবে না, তোমরা হবে শ্রেষ্ঠতম মানব, তবে অন্য কেউ এটি করলে সেও তোমাদের মতো হয়ে যাবে। আমলটি হলো, প্রত্যেক নামাজের পর তেত্রিশবার করে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুল্লিল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার পাঠ করবে।’ (সহিহ বুখারি)
রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি নিজ ঘরে পবিত্রতা অর্জন করল, তারপর মসজিদে কুবায় এসে কোনো নামাজ আদায় করল, সে ওমরাহর সওয়াব হাসিল করল।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)
ইসলাম শুধু সামর্থ্যবানদের জন্য পুরস্কারের দ্বার খুলে দেয়নি, বরং আন্তরিক নিয়ত ও আমলের মাধ্যমে প্রত্যেক মুমিনের জন্য কল্যাণ অর্জনের সুযোগ রেখেছে। তাই হজে যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই।
লেখক : ইসলামি গবেষক
