আবার জেগেছে ঢাকা গেট

ভারতের নয়াদিল্লি শহরের মাঝখানে অবস্থিত ‘দিল্লি গেট’। এটি সে দেশের মানুষের কাছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্থান। পর্যটকরা দিল্লিতে গেলে ‘দিল্লি গেইটে’ যেতে ভোলেন না। চারশ বছরের পুরনো শহর ঢাকারও রয়েছে ৩৬৩ বছরের পুরনো গেট। গৌরবময় এই ঐতিহ্য বহুদিন অবহেলিত থাকলেও নতুন করে আবারও সংস্কার করা হয়েছে।

এতে আবারও দৃশ্যমান হয়েছে ঢাকা গেট। নতুন পরিকল্পনায় দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় সেখানে চত্বর করা হয়েছে। দৃষ্টিনন্দন ঢাকা গেট শিগগিরই উন্মুক্ত হবে দর্শনার্থীদের জন্য। সেখানে লেখা থাকবে ঢাকা গেটের সঠিক ইতিহাস। ওই চত্বরে ঘুরতে এসে ঢাকার ঐতিহ্য দেখে ও অতীত জেনে মুগ্ধ ও স্মৃতিকাতর হবেন দর্শনার্থীরা।

এশিয়াটিক সোসাইটির ঢাকা কোষ এবং অন্যান্য ইতিহাস গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ১৬৬০ থেকে ১৬৬৩ সালের মধ্যে ‘ঢাকা গেট’ নির্মাণ করা হয়। ঢাকার সীমানা নির্ধারণ ও বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে এই গেট নির্মাণ করা হয়েছিল। আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাংলার সুবেদার হিসেবে পাঠানো হয় মীর জুমলাকে। তিনিই এই গেট নির্মাণ করেন। এই গেটের নাম ‘মীর জুমলার গেট, ময়মনসিংহ গেট, ঢাকা গেট ও রমনা গেট’ নামে পরিচিত। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮২৫ সালে চার্লস ডয়’স ঢাকা গেটের সংস্কার করেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঐতিহাসিক ঢাকা গেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দোয়েল চত্বর এলাকায় অবস্থিত। কার্জন হল থেকে দোয়েল চত্বর হয়ে টিএসসির দিকে যেতে তিন নেতার মাজার সংলগ্ন এলাকায় সড়কের দুই পাশ ও সড়ক বিভাজকজুড়ে ‘ঢাকা গেট’ অবস্থিত। এই গেটের একটি অংশ নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণা কেন্দ্রের দিকে, মাঝখানের অংশ সড়ক বিভাজকের মাঝখানে এবং অপরাংশ তিন নেতার মাজারের পাশে পড়েছে। মীর জুমলার ঐতিহাসিক কামানটি ঢাকা গেটের নবায়নযোগ্য শক্তি কমিশনের পাশে বসানো হয়েছে। ইট, সুরকি, কেমিক্যাল ও সুপারির রস দিয়ে ঢাকা গেটকে নান্দনিক করে তোলা হয়েছে। এখন ওই সড়ক দিয়ে গেলে যে কারও চোখে পড়বে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংস হতে বসা ঢাকা গেটকে সংস্কারের উদ্যোগ নেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। গত বছরের ২৪ মে তিনি ঢাকা গেটের সংস্কারকাজের উদ্বোধন করেন। মেয়র তাপসের নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি ছিল ঐতিহ্যের ঢাকা সংরক্ষণ। তিনি তার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় এই উদ্যোগ নেন। উদ্বোধনের দিন তিনি বলেছিলেন, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সব স্থাপনা ধাপে ধাপে সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হবে; যাতে করে পর্যটকরা এসে ঢাকাকে জানতে পারেন, বুঝতে পারেন এবং শিখতে পারেন। এই গেট সংস্কারে ডিএসসিসির ব্যয় বরাদ্দ ৭২ লাখ টাকা। 

প্রতœতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের শিক্ষক স্থপতি অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সেখানে তিনি ঢাকা গেটের সংস্কারকাজে যুক্ত শিল্পী ও শ্রমিকদের নির্দেশনা দিয়ে কাজ পরিচালনা করছিলেন। জানতে চাইলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকা গেটকে মীর জুমলার গেট বলা হয়ে থাকলেও এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট ডয়’সের সময়ে গেট নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এখন এই গেটের তিনটি অংশ দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু শুরুতে এমনটি ছিল না। শুরুতে সড়কটি এক লেনের হওয়ায় গেটের দুটি অংশ ছিল। পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে সড়কটি যখন দুই লেন করা হয়, তখন গেটের একটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়। তিন নেতার মাজারের অংশটি নতুন করে তৈরি করা হয়। সড়ক বিভাজকের অংশটি সেই ভাঙা অংশের একটি অংশ।

তিনি বলেন, মীর জুমলার কামান একসময় সদরঘাটে ছিল। পরে সেটা গুলিস্তানের ওসমানী উদ্যানে এনে রাখা হয়। সেখান থেকে কামানটি ঢাকা গেইটে এনে বসানো হয়েছে।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেকোনো শহরের ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা সে দেশের নগর সংস্থাগুলোর দায়িত্ব। কিন্তু ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়ে আগে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ঐতিহ্যের মাধ্যমে ওই শহরের ইতিহাস জানা যায়।

তিনি বলেন, ‘ডিএসসিসির বর্তমান মেয়র নির্বাচনী ইশতেহারে ঐতিহ্যের ঢাকা গঠনের অঙ্গীকার করেছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি আমাদের সেই সব ইশতেহার বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। নগর পরিকল্পনা বিভাগ থেকে “ঢাকা গেটের” নকশা করে দেওয়া হয়েছে। এরই আলোকে ঢাকা গেটের সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। শিগগিরই ঢাকা গেট জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।’