দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মাঠে নেমেছে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। তাদের এ নিরাপত্তা কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে পরিচয় শনাক্তের প্রযুক্তি অনসাইট আইডেন্টিফিকেশন অ্যান্ড ভেরিফিকেশন সিস্টেম (ওআইভিএস)। নতুন এ প্রযুক্তি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য র্যাবের কার্যক্রমে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
র্যাব বলছে, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশনা বাস্তবায়নে ভোটকেন্দ্র ও তার আশপাশের এলাকায় অনুপ্রবেশকারী বহিরাগতদের পরিচয় শনাক্তে র্যাবের মোবাইল টহল দল ওআইভিএস ডিভাইসটি ব্যবহার করবে। এ ছাড়া ডিভাইসটির মাধ্যমে এক এলাকার ভোটার অন্য এলাকায় প্রবেশ করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে কি না, তা শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
এ প্রসঙ্গে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন যাবৎ আত্মগোপনে থাকা অপরাধীরা নির্বাচনের আগে ও পরের দুদিন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওআইভিএস ব্যবহার করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক তাদের আগের অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
র্যাবের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট নিশ্চিত করতে এবারই প্রথমবারের মতো র্যাব ওআইভিএস ব্যবহার করছে। নির্বাচনী পরিবেশ বিনষ্ট করার লক্ষ্যে যারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চেষ্টা করবে তৎক্ষণাৎ তাদের পরিচয় নিশ্চিত করাসহ ভোটকেন্দ্র ও তার আশপাশের এলাকায় ঘোরাঘুরি করা সন্দেহজনক ব্যক্তিদের শনাক্তসহ ডিভাইসটির মাধ্যমে খুব সহজেই সহিংসতাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’
কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭ জানুয়ারি ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে সারা দেশে নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি র্যাব মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচনে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টির জন্য র্যাব গত ২৯ ডিসেম্বর থেকে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে প্রতিটি আসনে মোতায়েন রয়েছে। এ ছাড়া স্থাপন করা হয়েছে ৩০টির বেশি অস্থায়ী ক্যাম্প। নির্বাচন কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের নাশকতা কিংবা সহিংসতা প্রতিরোধে সারা দেশে ৭০০টির বেশি টহল দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করছে।
র্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধীদের শনাক্তে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে ওআইভিএস নতুন ধারা উন্মোচন করেছে। ওআইভিএস ডিভাইসটি র্যাবের কর্মকর্তারা পরিচালনা করেন। অপতৎপরতামূলক কাজে কেউ যাতে ডিভাইসটি ব্যবহারের সুযোগ না পায় সে ক্ষেত্রে ডিভাইসটির সুরক্ষা ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ডিভাইসটি র্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়ন ও কোম্পানি পর্যায়ে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ডিভাইসটি পরিচালনার জন্য বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের কোম্পানি কমান্ডাররা ডিভাইসটি পরিচালনা করছেন। এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ১২৫ জনের পরিচয় শনাক্তে এ ডিভাইসটি ব্যবহার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ডিভাইসের মাধ্যমে শুধু অপরাধী শনাক্তই নয়, প্রাথমিকভাবে পরিচয় শনাক্ত না হওয়া অনেক মৃতদেহের পরিচয়ও শনাক্ত করা হয়েছ। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে এ ডিভাইসের মাধ্যমে মানসিক প্রতিবন্ধী এবং প্রাথমিকভাবে পরিচয় শনাক্ত না হওয়া ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ডিভাইসটি দিয়ে ঘটনাস্থল থেকেই প্রাথমিকভাবে পরিচয় শনাক্ত না হওয়া ব্যক্তির আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গার প্রিন্ট), জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর বা জন্মতারিখ ব্যবহার করে জানা যাচ্ছে ব্যক্তির পরিচয়সহ অন্যান্য তথ্য।
র্যাবের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, ফিঙ্গার প্রিন্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং জন্মতারিখ ছাড়াও এ প্রযুক্তিতে দ্রুতই ছবি সংযোজন করা হবে। এতে করে কোনো ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত আরও সহজতর হবে। তদন্তের প্রয়োজনে র্যাব কোনো ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে বিষয়েও তথ্য থাকবে ডিভাইসটিতে। এ ছাড়া পাসপোর্ট, বিআরটিএ এবং পুলিশের ডেটাবেজের তথ্য সহায়তা ওআইভিএস ডিভাইসটির মাধ্যমে পাওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এ ডেটাবেজগুলোর তথ্য ওআইভিএসের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব হবে।
জানা গেছে, আধুনিক এ ডিভাইসটি ব্যবহার করে ইতিমধ্যে ছদ্মবেশ ধারণ করে দীর্ঘদিন পলাতক থাকা ২০০৫ সালে বাগেরহাটের চাঞ্চল্যকর মনু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া হেমায়েত কবিরাজ, কুড়িগ্রামে একই পরিবারের চারজনকে কুপিয়ে হত্যাসহ চারটি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া জালাল গাজী, ১৯৯৩ সালে রাজধানীর কেরানীগঞ্জে বাবা-ছেলেকে কুপিয়ে হত্যায় জড়িত মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আরিফ, ২০১৩ সালে রাজধানীর মতিঝিলে পুলিশ কনস্টেবল বাদল মিয়া হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও মৃত্যুদণ্ড পাওয়া রিপন নাথ ঘোষ, ২০০৬ সালে কেরানীগঞ্জের রোহিতপুর ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার আনোয়ার হোসেনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া কামাল উদ্দীনসহ দীর্ঘদিন ছদ্মবেশে পলাতক থাকা অসংখ্য অপরাধীর আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গার প্রিন্ট) ব্যবহার করে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। দীর্ঘদিন পলাতক মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া বাউল মডেল সেলিম ফকির, বহুল আলোচিত বিশ্বজিৎ হত্যা, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যাসহ বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর ও ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন ও বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘদিন ছদ্মবেশে পলাতক থাকা অপরাধীদের আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গার প্রিন্ট) ব্যবহার করে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।