রাজধানীতে ভোটের আগে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুনের ঘটনায় নিখোঁজ এলিনা ইয়াসমিনের ছয় মাসের শিশু সন্তান আরফান হোসেন শুধু তার মাকে খুঁজে ফিরছে। কয়েক দিন আগেও যে শিশুটি তার মায়ের কোল জুড়ে থাকত তাকে এখন স্বজনরা এক কোল থেকে আরেক কোলে নিয়ে মায়ের অভাব পূরণে ব্যতিব্যস্ত। পরিবারের সদস্যদের কথা, তারা বিশ্বাস করতে চান এলিনা বেঁচে আছে। তারপরও জীবিত হোক বা মৃত মানুষটাকে ফেরত চান তারা।
শিশুসন্তান আরফানসহ এলিনার ছয় স্বজন একসঙ্গে রাজবাড়ী থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। আগুনের পর থেকে নিখোঁজ এলিনা। আর তার সঙ্গে থাকা বোন ডেইজি আক্তার রত্না ও ডেইজির স্বামী ইকবাল বাহার খান রাজধানীর শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
হাসপাতালে এলিনার শিশু সন্তানকে আরফানকে কোলে নিয়ে বোন ডেইজি বলছিলেন, ‘কমলাপুর স্টেশন অল্প কিছু সময়ের দূরত্বে আছে জেনে এলিনা তার ব্যাগ গোছানোসহ ট্রেন থেকে নামার অন্যান্য প্রস্তুতির জন্য আরফানকে আমার কোলে দেয়। আর আমার স্বামী ইকবাল তাদের লাগেজগুলো দেখছিলেন। বড় ছেলে দিহান কিছুটা দূরে থাকলেও ছোট ছেলে রেহানও ছিল সঙ্গে। হঠাৎ করে স্বামী ইকবাল পেছন থেকে চিৎকার দিয়ে বলে আগুন আগুন। মুহূর্তের মধ্যে কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় ট্রেনের কামরা। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। বোন এলিনা পেছনেই ছিল। ট্রেনটির গতি একটু ধীর হলে আমি আরফান ও ছেলে রেহানকে নিয়ে লাফ দিই। পরে দেখি বোন নেই। এরপর অনেক চেষ্টা করেছি ভেতরে যেতে, কিন্তু পারিনি বাধার মুখে।’ ডেইজি, তার স্বামী ও দুই সন্তান চিকিৎসা নিচ্ছেন ধোঁয়ার প্রতিক্রিয়ায় শ্বাসকষ্টের জন্য।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বোনের ছেলেটার কী হবে? আমার চোখের সামনে আমার বোনটা নেই। আমরা বিশ্বাস করতে চাই আমার বোনটা বেঁচে আছে। তারে খুঁজে এনে দেন। জীবিত বা মৃত হোক মানুষটাকে ফেরত চাই।’
এলিনার ভাই মনিরুজ্জামান মামুন বলেন, ওই ট্রেনে আগুনের ঘটনায় চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে তার বোন এলিনাও থাকতে পারে। সে আশায় বোনকে শনাক্তে তার ও তার মায়ের ডিএনএ নমুনা নিয়েছে পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)।
একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরেক নিখোঁজ নাতাশা জেসমিনের স্বামী আসিফ মোহাম্মদ খান। হাসপাতালের শয্যায় চুপ করে শুয়েছিলেন। আসিফের বাবা আবু সিদ্দিক খান হাসপাতালে ডেইজির মতো একই সুরে বলেন, ‘আমরা মানুষটাকে ফেরত চাই মৃত বা জীবিত।’ তিনি জানান, তার ছেলের পেছন দিকটা পুড়েছে। শরীরের ৮ শতাংশ দগ্ধ। তবে চিকিৎসক বলেছেন, শ্বাসনালি ঠিক আছে। তার ছেলের স্ত্রী নাতাশাকে শনাক্তে নাতাশার মা ও ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা নিয়েছে সিআইডি।
এর আগে গত ৫ জানুয়ারি রাজধানীর গোপীবাগে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুনের ঘটনায় চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আহত হন ১০ থেকে ১৫ জন। নিহত চারজন পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়ায় তাদের চেনা দায়। এ ঘটনায় চারটি পরিবার তাদের স্বজন নিখোঁজের দাবি করে। তারা হলেন এলিনা ইয়াসমিন, চন্দ্রিমা চৌধুরী ওরফে সৌমি, নাতাশা জেসমিন ও আবু তালহা। তাদের মরদেহ শনাক্তে পুলিশ ডিএনএ নমুনা নিয়েছে।
আগুনের ঘটনায় হওয়া মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি ফেরদৌস আহমেদ বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিহত চারজনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। তারা তাদের পরিচয় উদঘাটনের চেষ্টা করছেন। চারটি পরিবার ওই চার মরদেহ তাদের স্বজনদের বলে দাবি করছেন। সে কারণে আদালতের অনুমতি নিয়ে চার মরদেহ শনাক্তে রক্তের সম্পর্কের আটজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষার ফল পেলে লাশ হস্তান্তরের বিষয়ে তারা ব্যবস্থা নেবেন। ততদিন পর্যন্ত লাশ মর্গে ফ্রিজে থাকবে।
রেলওয়ে পুলিশের ঢাকা জেলার সুপার আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ট্রেনে আগুনের ঘটনায় রেলওয়ে পুলিশ ছাড়াও অন্যান্য সংস্থা কাজ করছে। ডিবির হাতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নবী উল্লাহ নবী ও যুবদল নেতা কাজী মনসুর আলমকে ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডের জন্য আদালতে আবেদন করা হবে। অন্য সংস্থার কাছে কেউ গ্রেপ্তার হলে বা তাদের বিষয়ে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
ট্রেনে আগুনের ঘটনায় আহত হয়ে শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে আইসিইউতে চিকিৎসা নিচ্ছেন হালিমা বেগম। তার ছেলে রাসেল উদ্দিন সোহাগ দেশ রূপান্তরকে জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি যশোরের ঝিকরগাছা। তার খালাতো বোনের বাসা মুগদায় যাওয়ার জন্য সেদিন ট্রেনে ওঠেন মা। ট্রেনে আগুন লাগার পর তার মাকে কে বা কারা নামিয়েছেন তা জানেন না। তবে ঘটনার পরপরই হালিমাকে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন সেখান থেকে তাকে বার্ন ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। তার শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। তিনি আইসিইউতে আছেন।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. রায়হানা আউয়াল বলেন, গোপীবাগে ট্রেনে আগুনের ঘটনায় ১০ জন ইনস্টিটিউটে ভর্তি রয়েছেন। তাদের কারোর শরীরেই তেমন দগ্ধ না হলেও সবারই শ্বাসনালি পোড়া আছে। তাই সবাইকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, হালিমা আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে আছেন। বাকি নয়জনের মধ্যে গতকাল তিনজনকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার কথা ছিল।
১১ জানুয়ারি থেকে চলবে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেন: ভয়াবহ আগুনে কয়েকটি বগি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ট্রেনটি ১১ জানুয়ারি থেকে আবার চালু হবে।
বেনাপোল স্টেশন মাস্টার শাহিদুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ১১ জানুয়ারি দুপুর ১টার সময় বেনাপোল থেকে ঢাকার উদ্দেশে ট্রেনটি ছেড়ে যাবে। পরে ওইদিন রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে ট্রেনটি ঢাকা থেকে ফের বেনাপোলের উদ্দেশে ছেড়ে আসবে। ১১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ট্রেনটি সাপ্তাহিক বন্ধ থাকার কথা থাকলেও সেদিন এটি চালু করা হবে বলে জানান রেলওয়ের এ কর্মকর্তা।