ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে আবারও হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য একযোগে হুতিদের ৩০টির মতো অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানোর এক দিন পরেই আবার নতুন করে হামলা চালানো হলো। হুতি বিদ্রোহীরা প্রথম হামলার পরেই পাল্টা প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছিল। এর মধ্যেই গতকাল শনিবার সকালে নতুন হামলার খবর সামনে আসে। এদিকে দফায় দফায় হামলার পর ইয়েমেনের বিভিন্ন জায়গায় এর প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। হামলার বৈধতা নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই প্রশ্নের মুখে পড়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
অন্যদিকে এই হামলার পর হুট করেই বেড়েছে জ¦ালানি তেলের দাম। একাধিক যুদ্ধের মধ্যে নতুন আরেকটি সংঘাত স্থিতিশীল বিশ্ব ব্যবস্থাকে অস্থির করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সিএনএন ও বার্তা সংস্থা রয়টার্স কারও নাম উল্লেখ না করে জানায়, লোহিত সাগরে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জাহাজ থেকে মিসাইল হামলাটি করা হয়েছে। অন্যদিকে দুজন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এপিকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি রাডার সাইটকে টার্গেট করেছিল, যেটি সমুদ্রসীমায় জাহাজ পরিবহনের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
গাজায় ইসরায়েলের অবরোধ ও নির্মম হামলার শিকার ফিলিস্তিনিদের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে তাদের সমর্থনে লোহিত সাগরে চলাচলরত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা চালাচ্ছিল হুতিরা। তাদের দাবি, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কিত জাহাজগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। আর গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হামলা চালিয়ে যাবে তারা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের নিয়ে লোহিত সাগরে পাহারা দিতে মোতায়েন করে যুদ্ধজাহাজ। দুই পক্ষের এমন অবস্থানের মধ্যে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার উদ্বেগকে তীব্র করে বৃহস্পতিবার রাত থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাষ্ট্রের জঙ্গি বিমান, জাহাজ ও ডুবোজাহাজ হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইয়েমেনজুড়ে বিভিন্ন লক্ষ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। হামলার পর হুতিদের পক্ষ থেকে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
জবাবে শুক্রবার বাইডেন সতর্ক করে বলেছিলেন, তারা লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজগুলোতে আক্রমণ বন্ধ না করলে তিনি ইয়েমেনে আরও হামলা চালানোর নির্দেশ দিতে পারেন। লোহিত সাগর অর্থনৈতিকভাবে বিশে^র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ।
বাইডেন বলেন, ‘হুতিরা যদি তাদের এই আপত্তিকর আচরণ চালিয়ে যায় তাহলে নিশ্চিত করছি যে আমরা জবাব দেব।’
পেন্টাগন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ বাহিনী ইয়েমেনে হুতিদের ২৮টি সামরিক স্থাপনায় ৬০টি লক্ষ্যস্থলে আঘাত হেনেছে, এতে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীটির নতুন হামলা চালানোর সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।
অক্টোবরে ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধ বিস্তৃত হওয়ার অন্যতম সবচেয়ে নাটকীয় প্রদর্শনী ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনের এসব হামলা। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, উত্তেজনা বাড়ানোর কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই।
এদিকে এই পরিস্থিতিতে বড় শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের কার্গো জাহাজগুলোর লোহিত সাগর এড়িয়ে চলার জন্য রুট পরিবর্তন করছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা শুরুর পর এটি এই প্রথম। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ওই অঞ্চলের কিছু ছবিতে গত নভেম্বরে বাণিজ্যিক জাহাজে হুতিদের প্রথম হামলার পর এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। তাতে দেখা যাচ্ছে বহু জাহাজ রুট পরিবর্তন করে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ এলাকা দিয়ে চলাচল শুরু করেছে।
মেরিটাইম ট্রাফিক ওয়েবসাইট অনুযায়ী, লোহিত সাগরের রুট ধরে তেল ও গ্যাস ট্যাংকার যাতায়াত খুব বেশি কমেনি। যদিও ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইনডিপেনডেন্ট ট্যাংকার ওনারস (ইন্টারট্যাংকো) জাহাজগুলোকে সম্ভব হলে ওই এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে তেলের দামেও।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের হামলার প্রতিবাদে ইয়েমেনের রাজধানী সানার রাস্তায় বিশাল বিক্ষোভ-সমাবেশে নেমেছে হাজার হাজার হুতিপন্থি। তারা ‘খোদা মহান,’ আমেরিকা নিপাত যাক, ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’, ‘ইসলামের জয় হোক’ ধ্বনিতে সেøাগান দিয়েছে।
বিবিসি বলছে, ইয়েমেনে এমন গণবিক্ষোভ প্রায়ই দেখা গেলেও শুক্রবারের এই বিক্ষোভ-সমাবেশ ছিল অপ্রত্যাশিত রকমের বড়। বিক্ষোভে যোগ দেওয়া হুতি সুপ্রিম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্য মোহাম্মদ আলি আল-হুতি যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করে বলেন, ইয়েমেনে আপনাদের হামলা সন্ত্রাস। যুক্তরাষ্ট্র একটা শয়তান। আমরা আমেরিকার উপকূলে আঘাত হানিনি। আমেরিকার দ্বীপপুঞ্জে যাইনি। সেগুলোতেও আমরা আক্রমণ শানাইনি। অথচ আমাদের দেশে আপনারা হামলা চালিয়েছেন। এটি সন্ত্রাস।