নিয়োগের আইনি লড়াইয়ে জিতলেন সেই ২৮৫ জন

তিন বছরের বেশি সময় আগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও নিয়োগ পাননি তারা। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে রিট করে অধিকার আদায় করেছেন ২৮৫ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন চাকরিপ্রার্থী।

গতকাল রবিবার হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এক রায়ে ১০ শতাংশ প্রতিবন্ধী (বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি) কোটা পূরণ করে ওই ২৮৫ জনকে নিয়োগ দিতে বলেছে। আদেশ পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে তাদের নিয়োগ দিতে হবে।

এ-সংক্রান্ত চারটি রিট আবেদনের ওপর দেওয়া রুল যথাযথ ঘোষণা করে বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। এক বছর আগে দেওয়া এ রুলের শুনানি গত ১১ ডিসেম্বর শেষ হলে রায়ের জন্য এই দিন ধার্য করেছিল হাইকোর্ট।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের তথ্যমতে, প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ দিতে ২০২০ সালের অক্টোবরে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়। রিট আবেদনকারীরা নিয়োগের জন্য আবেদন করেন। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তারা মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু ২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর নিয়োগ পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা যায় সেখানে কোনো বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার বিধান অনুসরণ করা হয়নি।

রিটকারীরা শ্রবণ, বাক, দৃষ্টি ও শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। তাদের মধ্যে একজন গত বছর জানুয়ারিতে রিট আবেদন করেন। ওই বছর ১৭ জানুয়ারি রুল দেয় হাইকোর্ট।

রুলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পরীক্ষা-২০২০-এর প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফলে ১০ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা পূরণ করে রিটকারী প্রার্থীদের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ না দেওয়া কেন বেআইনি হবে না এবং ১০ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা পূরণ করে রিটকারীদের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ দিতে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না, তা জানতে চায় হাইকোর্ট। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব, জনপ্রশাসন সচিব ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে রুলের জবাব দিতে বলে হাইকোর্ট।

পরে বিভিন্ন সময় আরও তিনজন রিট আবেদন করেন। সবগুলো আবেদন একসঙ্গে করে হাইকোর্ট রুল শুনানি গ্রহণ করে। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল এ রায় হলো।

রিটকারীদের আইনজীবী আবেদনের যুক্তিতে বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৯-এর সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী, নারী, পোষ্য ও পুরুষ কোটা পূরণের ক্ষেত্রে আপাতত বলবৎ, অন্য কোনো বিধি বা সরকারি সিদ্ধান্তে কোনো বিশেষ শ্রেণির কোটা নির্ধারিত থাকলে সেই কোটা-সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী নিয়োগ দিতে হবে। অন্যদিকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ৩৫ ধারা অনুযায়ী, আপাতত বলবৎ অন্য আইন যাই থাক না কেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী উপযোগী কর্মে নিযুক্ত করতে কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা বা তার প্রতি কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না। এ ছাড়া ১৯৯৭ সালে সরকারের পরিপত্র অনুযায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির সহকারী শিক্ষক পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ পদ প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের মাধ্যমে পূরণ করার বিধান রয়েছে।

আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়া। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মুনতাসীর উদ্দিন আহমেদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাসগুপ্ত।

অ্যাডভোকেট সিদ্দিক উল্লাহ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২৮৫ জনের ৫৫ জন বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ। বাকিরাও কৃতিত্বের সঙ্গে শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘কোটা-সংক্রান্ত বিধান এবং প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষা-সংক্রান্ত আইনে তাদের বঞ্চিত করার সুযোগ নেই। সংবিধানে সমতার কথা বলা হয়েছে। সর্বোপরি এই ২৮৫ জন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এত কিছুর পরও তাদের নিয়োগ না দেওয়া ছিল মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। এই রায় প্রতিবন্ধীদের অধিকার সুরক্ষায় একটি মাইলফলক।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অমিত দাসগুপ্ত বলেন, ‘হাইকোর্ট যে রুলটি দিয়েছিল, তা যথাযথ ঘোষণা করে তাদের নিয়োগে নির্দেশ দিয়েছে।’