স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেছেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কথা আমিও জানি। আমি নিজে কখনো দুর্নীতির ধারে-কাছে যাইনি। এ বিষয়ে কোনো ছাড়ও দেব না। দুর্নীতির ব্যাপারে আমি জিরো টলারেন্স।’
দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রীকে ফোন দেবেন বলেও জানান নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, তুমি কাজ করো। যদি কোনো অসুবিধা হয় আমাকে টেলিফোন করো। আমি সেটাই করব।’
গতকাল রবিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পর সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এর আগে সকাল ১০টার দিকে সচিবালয়ে যান ও নিজ দপ্তরে যোগ দেন নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন। সকালে সচিবালয়ে আসার পর মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিভিন্ন অধিদপ্তরের মহাসচিব, পরিচালক, বিভিন্ন হাসপাতালের পরিচালকসহ কর্মকর্তারা মন্ত্রীকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। মন্ত্রী সবার সঙ্গে পরিচিত হন। পরে দুপুর ১২টায় মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন মন্ত্রী।
নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কীভাবে ভালো চিকিৎসা দেওয়া যায়, সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকারও ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ঢাকায় রোগীর চাপ কমাতে, স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করলে স্বাস্থ্য খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এই মন্ত্রণালয়ে যা করার দরকার আমি আমার সাধ্যমতো সব করব। আমি যখন প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করতাম, তখন রাস্তাঘাট ছিল না। সাইকেলে, নৌকায় যাতায়াত করতাম। এখন প্রত্যেকটা থানা ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাস্তাঘাট সবকিছু আছে। সুতরাং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করা এখন আরও সহজ হয়েছে।’
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার কর্মজীবনটা শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে। টুঙ্গিপাড়ায় সেই বঙ্গবন্ধু সমাধিতে সালাম জানিয়ে আমি আমার মন্ত্রিত্ব জীবন শুরু করলাম। আমার জীবন ধন্য। আমি আশা করি, আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা পালন করতে পারব।’
স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেন, ‘আগে যেমন আমি সাধারণ বার্ন রোগীদের জন্য সব সময় ছুটে গেছি, আমার লক্ষ্যই ছিল সাধারণ মানুষ, যারা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত, তাদের সেবা দেওয়া, এখনো তাই করব। আমি থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে অপারেশন করেছি। সেখানে রোগীরা কেউ স্যান্ডেল পরে আসে না। সবাই খালি পায়ে আসে। সুতরাং আমার লক্ষ্য থাকবে কীভাবে এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। আমি বিশ্বাস করি, স্বাস্থ্যসেবাকে যদি সারা দেশে বিকেন্দ্রীকরণ করা যায়, তাহলে ঢাকা শহরে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে রোগীদের যে চাপ, রোগীরা মাটিতে শুয়ে থাকে, সেই চাপ কমাতে পারব। এই লক্ষ্যেই আমি কাজ করে যাব।’
এ সময় নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সবার সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা সবাই আমাকে সাহায্য করবেন। আমি মনে করি আমার যে দুই সচিব, যদি আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখে, আশা করি আমি পারব। আমি আগে যা ছিলাম, এখনো তাই আছি। আপনারা প্রত্যেকে আমাকে সহযোগিতা করলে, আমি আমার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে আমি কালকেও (গত শনিবার) বলেছি, আপনি আমাকে এত মানুষের মধ্যে বেছে নিলেন, আমি পারব কি না জানি না। তিনি বলেছেন, তুমি অবশ্যই পারবা। আমি যেন ওনার স্বপ্নটা পূরণ করতে পারি। আমরা যেন স্বাস্থ্যসেবাটাকে সবার জন্য নিশ্চিত করতে পারি। আমরা যদি প্রত্যেকে একসঙ্গে কাজ করি, একে অন্যকে সহযোগিতা করি, অসম্ভব কিছু না।’
বার্ন ইউনিট গড়ে তুলতে নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার অতীত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘৫ শয্যার বার্ন ইউনিটকে ৫০০ শয্যা করতে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। অনেকের কাছে গেছি। অনেকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আমার ফাইল ছুড়ে মেরেছে। এ রকম ঘটনাও ঘটেছে। আমি ধৈর্য ধরে, সবার সহযোগিতা পেয়েই আজ এখানে এসেছি। সুতরাং স্বাস্থ্য সেক্টরেও আমি চেষ্টা করব।’
স্বাস্থ্য সেক্টর অনেক বড় ও এখানে অনেক কাজ উল্লেখ করে ডা. সামান্ত লাল বলেন, ‘আজ (গতকাল রবিবার) প্রথম দিন এখানে এলাম। একটু সময় লাগবে। সবার সঙ্গে বসব। একটা পরিকল্পনা করব। এই মন্ত্রণালয়ের যারা কর্মকর্তা ও বাইরে যারা আছেন, সবার কাছে অনুরোধ, আপনারা যেকোনো সময় যেকোনো কিছুর জন্য আমার কাছে আসবেন। আমার দরজায় কোনো প্রটোকল লাগবে না। চলে আসবেন। আমি আগের মতোই থাকব। একটু উপদেশ দেবেন। আমরা নিশ্চয় কাজ করতে পারব।’
গত ১১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি নতুন সরকারে একজন টেকনোক্র্যাটমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।
পুরনো কর্মস্থল পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী : কয়েক দিন আগেও যে ইনস্টিটিউটে রোগীদের সেবায় দিনরাত খেটেছেন, গতকাল সেই ইনস্টিটিউটেই গেলেন রোগীদের খোঁজখবর নিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে। এই শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন।
গতকাল মন্ত্রণালয় থেকে বিকেলে ছুটে যান পুরনো কর্মস্থল শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট পরিদর্শনে। এ সময় ভুটান থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী কার্মডেবাসহ ইনস্টিটিউটের অন্য রোগীদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কার্মডেবার পাশে দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানতে চান ‘তোমার কোনো সমস্যা হচ্ছে? খাবার খেতে চাও, খেতে পারো?’
এ সময় রোগীর মাথায় হাত রেখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘তোমার মুখমণ্ডল তুমি দেখেছো? ঠিক আছে? কোনো চিন্তা করো না, আমরা আরও সার্জারি করব এবং সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাকে আরও সুন্দর লাগবে।’