ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাসহ সার্বিক বিষয়ের দেখভাল করার জন্য আবাসিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে।
বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই জানে না তাদের দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত আবাসিক শিক্ষকের পরিচয়। নিয়োগ পাওয়ার পর এ বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য। আবাসিক শিক্ষকদের বিশেষ নজরদারিতে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হলগুলোর আবাসিক শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় নিতে বিশেষ অ্যাপস চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আবাসিক শিক্ষকদের বলা হয়েছে, তারা শিক্ষার্থীদের কক্ষ পরিদর্শন করবেন ও পরিদর্শনকালীন প্রতিটি কক্ষের তথ্য ভিডিও অথবা ছবিসহ অ্যাপসে ইনপুট দেবেন। এতে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত হবে। তথ্য ইনপুট হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে তা উপাচার্য ও সংশ্লিষ্ট হলপ্রাধ্যক্ষরা জানতে পারবেন। অ্যাপসটি এ মাসেই চালু হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উপাচার্যের নির্দেশে আবাসিক শিক্ষকদের জন্য একটি অ্যাপস তৈরি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এটি বিকশিত (ডেভেলপড), উপাত্ত প্রবেশনের (ডেটা এন্ট্রি) কাজ শেষ হওয়ার পথে। আশা করি, আমরা এ মাসেই চালু করতে পারব। এখন আবাসিক শিক্ষকরা হল পরিদর্শন করে অনলাইনেই তাদের রিপোর্ট জমা দেবেন। প্রতিটি কক্ষের তথ্য রিপোর্টে থাকতে হবে। প্রতিবেদন হলের প্রভোস্ট, প্রক্টর ও উপাচার্য দেখতে পাবেন।’
জানা গেছে, শিক্ষকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের সার্বিক দেখভালের জন্য হলভেদে ১০-১৫ জন আবাসিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা হলের বিভিন্ন তলা, ব্লক অথবা ভবনের দায়িত্বে থাকেন। তাদের জন্য বাসা বরাদ্দ থাকে, তারা নির্ধারিত সম্মানী ও ভাতা পান, পদোন্নতির ক্ষেত্রেও তারা অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন। প্রভোস্টসহ প্রশাসনিক অন্যান্য পদে যেতেও এ অভিজ্ঞতা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আগে শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক কাজ করলেও বর্তমানে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে শিক্ষার্থীরা; বিশেষ করে ছেলেদের হলে পদটি নামে মাত্র আছে।
আবাসিক শিক্ষকদের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নীতিমালা থাকলেও তা মানছেন না বেশিরভাগ শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন সূত্রে পাওয়া নির্দেশনায় দেখা যায়, আবাসিক শিক্ষকরা সপ্তাহে অন্তত দুদিন নিজ নিজ ব্লক বা তলার শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যে হল-অফিসে অবস্থান করবেন, সপ্তাহে অন্তত এক দিন নিজ নিজ তলা বা ব্লক পরিদর্শন করবেন। মাসে অন্তত একবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করবেন। কক্ষভিত্তিক হালনাগাদ তালিকা সংরক্ষণ করা ও মাসে অন্তত একবার আবাসিক শিক্ষকদের একযোগে পরিদর্শনের (গ্রুপ ভিজিট) নির্দেশনা রয়েছে।
যেসব শিক্ষক এ নির্দেশনা অমান্য করবেন কিংবা দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একটি হলের প্রাধ্যক্ষ (প্রভোস্ট) দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাউজ টিউটরদের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন উপাচার্য। প্রাধ্যক্ষ কমিটির সভায় এ ব্যাপারে কড়া নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বয়ংক্রিয়করণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আবাসিক শিক্ষকদের জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারা যে কার্যক্রম পরিচালনা
করবেন তা অ্যাপসের মাধ্যমে জানাবেন। পরিদর্শনলব্ধ ও পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্যাদি অ্যাপসে হালনাগাদ করবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা দেখবে। এর মাধ্যমে প্রশাসন ছাত্রদের সব তথ্য জানতে পারবে, তাদের কোনো সমস্যায় আছে কি না, বুঝতে পারবে এবং শিক্ষকরা তাদের দায়িত্ব পালন করছেন কি না, তাও জানতে পারবে।
বিজয় একাত্তর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আবদুল বাছির বলেন, ‘আবাসিক শিক্ষকরা কখন ব্লকে যাচ্ছেন, কখন পরিদর্শন করছেন এবং সেখানকার পরিস্থিতি কী সেসব বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানার জন্য একটি অ্যাপস তৈরি হচ্ছে। আবাসিক শিক্ষকদের বিষয়ে কিছু অভিযোগ ছিল, সেসবের কিছু সত্যতাও ছিল। আশা করি, সেগুলো আর থাকবে না।’
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘আমাদের হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক শিক্ষকদের তদারকির ব্যবস্থা আছে। এটি যেন আরও শক্তিশালী হয় সেজন্য আমরা একটি অ্যাপস তৈরি করছি। আবাসিক শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কক্ষে গিয়ে অসুবিধাগুলো জানবে এবং সেগুলোর ছবি ও ভিডিও অ্যাপসে ইনপুট দেবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রাধ্যক্ষ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তা দেখতে পারবেন এবং আমিও জানতে পারব। এটি হলে শিক্ষার্থীদের সমস্যা অনেক কমে যাবে।’