সুইজারল্যান্ডের দাভোস নগরীর পাহাড়ি অবকাশকেন্দ্রে বিশ্বের আড়াআড়ি বিভাজন আরও একবার উন্মোচিত হলো। অভিন্ন ইউরোপের নেতৃত্বের সঙ্গে চীনা নেতার পরোক্ষ কথার লড়াই দেখা গেল। মূলত মূর্ত হয়ে উঠেছিল, চীনা নীতির সঙ্গে পশ্চিমা মূল্যবোধের লড়াই। দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফেরামের (ডব্লিউএফপি) এবারের সম্মেলনে চীনের প্রতিনিধিত্ব করছেন প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং। অন্যদিকে ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষে ছিলেন সংস্থার প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। দাভোসের বার্ষিক সম্মেলনে বিশ্বের প্রভাবশালী রাজনীতিক ও অভিজাত ব্যবসায়ীদের সামনে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) প্রভাবশালী নেতা ও দেশের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং অব্যাহত অস্থিরতা পার করা চীনা অর্থনীতিতে বিনিয়োগের জন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আবার একই সময় উরসুলা ভন ডার লিয়েন দাভোসের মঞ্চে গণতন্ত্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের পক্ষে দৃঢ় আওয়াজ তোলেন। দাভোসে গত মঙ্গলবার লি ছিয়াং এবং ভন ডার লিয়েন বক্তব্য রাখেন। এ সময় দুই নেতার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, দুই নেতা নিজ নিজ শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক চালচিত্র এবং দুটি অঞ্চলের নিজ নিজ পরিস্থিতির সপক্ষে কথা বলেছেন। দুই নেতা একে অন্যকে সরাসরি কোনো কথা না বললেও দাভোসের মঞ্চ যেন হয়ে ওঠে বিশ্বের দুটি প্রান্তের নীতির লড়াই। দাভোসে বেইজিং এবং পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে ‘অর্থনৈতিক খাতে আস্থা ও সহযোগিতা বিস্তৃত করতে’ ছিয়াং পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি সামষ্টিক অর্থনীতিতে আরও সহযোগিতা, চীনকেন্দ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পথে প্রতিবন্ধকতা মুক্ত রাখার আহ্বান, সবুজ জ্বালানির লক্ষ্যকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতে আরও সহযোগিতার কথা বলেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, পুরো বক্তব্যে ছিয়াং একবারও যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি। পরোক্ষভাবে খামখেয়ালি, অবিশ^স্ত ও আধিপত্য বিস্তারকারী প্রভৃতি উপমা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝিয়েছেন। ছিয়াংয়ের বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল, বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। কারণ বিনিয়োগকারীরা চীনের অর্থনীতির সাম্প্রতিক
শ্লথগতি, শাসনব্যবস্থার সর্বগ্রাসী কর্তৃত্ববাদী আচরণ এবং বাজারে মাত্রাতিরিক্ত হস্তক্ষেপকারী প্রবণতা নিয়ে অখুশি বলেই মনে করা হয়। নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে থেকে বিদেশি বিনিয়োগের পরিসংখ্যান রাখা শুরু করে বেইজিং। তখন থেকে গত বছরের সর্বশেষ প্রান্তিক পর্যন্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ত্রৈমাসিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন থেকে রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগ চলে গেছে। নিজের বক্তব্যে চীনা অর্থনীতিকে সুইস আল্পস পর্বতের সঙ্গে তুলনা করেন ছিয়াং। তিনি আরও বলেন, চীনা অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করা কোনো ঝুঁকির বিষয় নয়, বরং সুযোগ। উল্টোদিকে ভন ডার লিয়েন ২০ মিনিটের বক্তব্যে গণতন্ত্র শব্দটি নয়বার এবং স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করেন ছয়বার। অপতথ্য দ্বারা চালিত ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের যুগে ইউরোপকে বিশ্বের নেতা হিসেবে তুলে ধরেন এবং বিশ্বব্যাপী আস্থার সংকট পুনরুদ্ধার ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যৌথ চেষ্টার কথা বলেন।
ভন ডার লিয়েন উল্লেখ করেন, বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করলেই হবে না, বরং ব্যবসা ও সরকারের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
ইউরোপীয় নেতা সতর্ক করেন, যুদ্ধোত্তর যুগে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ) বিশ্ব এখন বৈশ্বিক শৃঙ্খলের প্রশ্নে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। একে অন্যকে জটিল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘ব্যবসার স্বাধীনতা নির্ভর করে রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্বাধীনতার ওপর। এ কারণে আমি বিশ্বাস করি, আমাদের গণতন্ত্রকে রক্ষা করা এবং একে ঝুঁকির হাত থেকে বাঁচানো; সেই সঙ্গে একে হস্তক্ষেপকারীদের হাত থেকে রক্ষা করা আমাদের সাধারণ ও স্থায়ী দায়িত্ব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের আস্থা আরও পুনর্গঠন করতে হবে এবং ইউরোপ মূল দায়িত্ব পালন করতে প্রস্তুত।’