শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে জলাশয়ের পানিতে ভেসে থাকা শাপলা ফুল আর পাতার ফাঁকে অতিথি পাখির জলকেলি, দল বেঁধে উড়ে যাওয়া আবার ফিরে আসা, জলাশয়ের বুক চিরে একপাশ থেকে আরেক পাশে ছুটে চলার দৃশ্য আর তাদের কলতানে এক সময় মুখরিত থাকত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ক্যাম্পাস। নানা জাতের পাখির সেই মিলনমেলা দেখতে ক্যাম্পাসে জমে উঠত মানুষের মেলাও। প্রায় দুই যুগ আগে এসব কারণেই প্রথম পাখি মেলা শুরু করেছিল বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব। ২০০৪ সাল থেকে মেলা আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ সরাসরি সম্পৃক্ত হয়। কিন্তু গেল কয়েক বছর ধরে ক্যাম্পাসে আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে পাখির আনাগোনা। একসময় দুই শতাধিক প্রজাতির পাখি ক্যাম্পাসের জলাশয়গুলো আসলেও এখন তা হাতেগোনা কয়েকটিতে নেমেছে। ফলে আগের মতো পাখিদের কিচিরমিচির আর শোনা যায় না। এমন পরিস্থিতিতেই আয়োজন করা হয়েছে ২২তম পাখি মেলা।
গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে বসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২তম পাখি মেলা। সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তন প্রাঙ্গণে উদ্বোধনের মাধ্যমে মেলার কার্যক্রম শুরু হয়। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের আয়োজনে, দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাসে মেলা শুরু হলেও পাখিশূন্য ক্যাম্পাসে সেটি ছিল বড় বেমানান।
পাখি সংরক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে পাখি মেলার আয়োজন করাকে অহেতুক বিলাসিতা বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পাসের জলাশয়গুলো প্রায় অতিথি পাখিশূন্য। শীতকালে জাহাঙ্গীরনগরে অতিথি পাখি নেই। নানান অব্যবস্থাপনা আর খামখেয়ালিপনায় পাখি আসছে না। এলেও উপযুক্ত পরিবেশ না পেয়ে চলে যাচ্ছে কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেদিকে খেয়াল না করে মেলা আয়োজন করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর অক্টোবর মাসের শুরুর দিকে শীতপ্রধান দেশগুলো থেকে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি আসা শুরু করে ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বরের পাশের জলাশয়, স্কুল অ্যান্ড কলেজের খেলার মাঠের পূর্বপাশের জলাশয়, ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারসংলগ্ন জলাশয়, নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনের জলাশয় এবং বোটানিক্যাল গার্ডেনসংলগ্ন জলাশয়ে অতিথি পাখিতে পূর্ণ থাকত। দেশি-বিদেশি মিলিয়ে দুই শতাধিক পাখি দেখা যেত। কিন্তু আগের তুলনায় গত দুই-তিন বছরে পাখির আগমন অনেক কমে এসেছে। এ বছর জানুয়ারি মাসেও জলাশয়গুলোতে পাখির দেখা নেই। নেই আগের মতো পাখিদের কিচিরমিচির।
সংশ্লিষ্টরা বলছে, বিভিন্ন জায়গায় অপরিকল্পিত বহুতল ভবন নির্মাণ, সময়মতো জলাশয় সংস্কার না করা, লেকের পাড়ে জনসমাগম এবং কোলাহলের কারণে পাখি আসা কমে গেছে।
গতকাল সরেজমিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়গুলো ঘুরে দেখা গেছে, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বসাধারণের প্রবেশের নিষিদ্ধ এলাকা ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারসংলগ্ন জলাশয় ছাড়া অন্য কোনো জলাশয়ে পাখি নেই।
তবে পাখি না থাকলেও মেলা উপলক্ষে নানান কর্মসূচির আয়োজন করে কর্তৃপক্ষ। অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন প্রতিযোগিতা। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় পাখি দেখা প্রতিযোগিতা, পাখিবিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, শিশু-কিশোরদের জন্য পাখির ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা, টেলিস্কোপ ও বাইনোকুলারস দিয়ে শিশু-কিশোরদের পাখি পর্যবেক্ষণ, পাখিবিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় পাখি চেনা প্রতিযোগিতা এবং সবার জন্য উন্মুক্ত পাখিবিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
এ ছাড়া মেলায় বিগ বার্ড বাংলাদেশ অ্যাওয়ার্ড, সায়েন্টিফিক পাবলিকেশন অ্যাওয়ার্ড, কনজারভেশন মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড ও স্পেশাল রিকগনিশন অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। প্রতি ক্যাটাগরিতে একজনকে অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়।
মেলায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান বলেন, গত দুই-তিন বছর ক্যাম্পাসে পাখি কম আসছে। এর প্রধান কারণ হলো জলাশয়ের পাড়ে জনসমাগম। মানুষের ভিড়ে পাখিরা বিরক্ত হয়। ফলে তারা সেখানে বসতে আগ্রহ দেখায় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলম বলেন, প্রতিবছর পাখি মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ ছুটে আসে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য। এ বছর ক্যাম্পাসে পাখি কম এসেছে। কারণ মানুষ জলাশয়ের পাড়ে গিয়ে পাখিদের বিরক্ত করে। পাখিদের দিকে ঢিল ছুড়ে মারে। বহিরাগতরা ঘুরতে এসে পানিতে প্লাস্টিকসহ ময়লা-আবর্জনা ফেলে রেখে যায়। এতে জলাশয়ের পরিবেশ নষ্ট হয়। আমরা চেষ্টা করছি বিষয়টি সমাধানের জন্য।