আসল নাম তার কাজী মাহবুব হলেও গেল দুই দশক ধরে তিনি যেখানে থাকতেন সেখানকার লোকজন তাকে চেনে কেনু মিয়া নামেই। ২০০৪ সালে সোনাগাজী উপজেলার চরছান্দিয়া ইউনিয়নের ইসলামপুরে আসেন মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক কাজী মাহবুব। নিজের নাম-পরিচয় কিছু বলতে পারেননি সে সময়। তারপরও আশ্রয় মেলে স্থানীয় এছাক মেম্বারের বাড়িতে। সেখানেই কেনু মিয়া নামে ডাকা শুরু হয় তাকে। পরে গেল ২০ বছরের মধ্যে আরও দুই বাড়িতেও থেকেছেন তিনি। মানসিক ভারসাম্যহীন হলেও শান্ত স্বভাবের কারণে সবারই প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন তিনি। ওই গ্রামের সবারই মায়া পড়ে যায় তার ওপর। কিন্তু গত শুক্রবার কাজী মাহবুব ওরফে কেনু মিয়ার ভাই ও চাচা এসে তাকে নিয়ে গেছেন কুমিল্লার বাড়িতে। ওই বাড়ি থেকেই ১৯৯৬ সালে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন তিনি।
জানা গেছে, গত ২০০৪ সালে সোনাগাজী উপজেলার চরছান্দিয়া ইউনিয়নের ইসলামপুরে আসেন কেনু মিয়া। সে সময় গ্রামের সবাই ধরে নিয়েছিলেন কেনু মিয়ার পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। কারণ পরিবার নিয়ে কেনু মিয়ার ভাবনা ছিল না। নিজের কেউ আছেন সেটাও কখনো বলেননি। মাঝে মধ্যে অন্যের বাড়িতে গিয়ে দুমুঠো ভাত খেতে চাইতেন। গত বুধবার সকালে দৈনিক দেশ রূপান্তরের সোনাগাজী প্রতিনিধি আবুল হোসেন রিপনের বাড়িতে গিয়ে ভাত খেতে চাইলে কেনু মিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন তিনি। রিপন কেনু মিয়াকে নিয়ে ভিডিও ধারণ করে সোনাগাজীর আলো নামক ফেসবুক পেজে পোস্ট দেন। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
আবুল হোসেন রিপন বলেন, ভিডিওটি পোস্টের পর ওই দিন বিকেলে কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কানকোপাত ইউনিয়নের বেলাল কাজী নামে সাবেক ইউপি সদস্য ফোন করে ভিডিও কলে কেনু মিয়াকে দেখতে চান। তার অনুরোধে রাতে কেনু মিয়াকে খুঁজে ভিডিও কলে কথা বলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কেনু অসংলগ্ন কথা বলতে থাকেন। ওই সময় বেলাল নামের ওই ব্যক্তি জানান, কেনু মিয়ার আসল নাম কাজী মাহবুব। তিনি তার চাচা হন।
রিপন জানান, পরদিন বেলাল ফের ভিডিও কলে ফোন করে এক বৃদ্ধা ও মধ্যবয়সী এক পুরুষকে সামনে এনে নিশ্চিত করেন, সোনাগাজীতে কেনু মিয়া পরিচয়ে বসবাস করা ব্যক্তি ২৫ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া তাদের স্বজন কাজী মাহবুব। ওই নারী নিজেকে কেনু মিয়ার মা ও পুরুষ ভাই বলে পরিচয় দেন। ওই সময় তারা সোনাগাজীতে এসে কেনু মিয়াকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে আকুতি জানান।
রিপন বলেন, কেনু মিয়াকে নিয়ে যেতে সোনাগাজীতে আসার বিষয়ে গ্রামবাসীকে অবহিত করলে তারা সায় দেয়। পরে আমি ঘটনাটি সোনাগাজী মডেল থানার ওসিকে অবহিত করলে তিনি ঠিকানা যাচাই করে সব ঠিকঠাক থাকলে কেনু মিয়াকে পরিবারের কাছে তুলে দিতে সম্মতি দেন। শুক্রবার দুপুরে কাজী বেলাল ও মাহবুবের ভাই কাজী বাবুল সোনাগাজীতে এসে সিম্যান জেবল হকদের বাড়িতে যান। ভাই ও চাচাকে কাছে পেয়ে একে অপরকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকলে উপস্থিত মানুষের মধ্যে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।
কাজী বাবুল বলেন, আমাদের বাড়ি কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কনকাপৈত ইউনিয়নের পাঠানপাড়া গ্রামে। আমাদের বাবার নাম কাজী ইউনুস ও মায়ের নাম মনোয়ারা। আমার ভাই কাজী মাহবুব ১৯৯৪ সালে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমরা চিকিৎসা করালেও কোনো উন্নতি হয়নি। পরে ১৯৯৬ সালের মার্চ মাসে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। তারপর আমরা বহু খোঁজাখুঁজি করেও তারা সন্ধান পাইনি, আমরা ধরে নিয়েছি তিনি মারা গেছেন।
কাজী বাবুল বলেন, সাংবাদিক ভাইয়ের ভিডিও দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না আমার ভাই বেঁচে আছেন! ভাইয়ের হারিয়ে যাওয়ার শোকে বাবা মারা গেছেন।
সিম্যান জেবল হক বাড়ির বাসিন্দা আকবর হোসেন বাকুল বলেন, পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা কেনু মিয়াকে তার ভাই ও চাচার হাতে তুলে দিলে তারা তাকে বাড়িতে নিয়ে যান। চলে যাওয়ার সময় তাকে বেশ হাসিখুশি দেখো গেছে। কেনু মিয়াকে নিয়ে যাওয়ার সময় এলাকায় কয়েকশ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এলাকার অনেক নারী-পুরুষকে এ-সময় কাঁদতে দেখা য়ায়, দীর্ঘদিন অবস্থানের কারণে তার প্রতি সবার মায়া জন্মেছিল।
এদিকে শনিবার বিকেলে মোবাইলে কথা হয় বাবুল কাজীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের এলাকার শত শত লোক ভাইকে দেখতে আসছেন। ভাই এখন খুব বেশি কথা বলছেন না। তবে মনে হয় সবাইকে আস্তে আস্তে চিনতে পারবেন। আমার বৃদ্ধ মা ভাইকে পেয়ে খুব খুশি। আমরা চিন্তাও করতে পারিনি এত বছর পর ভাইকে ফিরে পাব।