গাজীপুরে পুলিশের করা একটি ডাকাতির প্রস্তুতি মামলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অভিযুক্ত ছয় যুবকের পরিবার। তাদের দাবি, দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া একটি ট্রাক থামাতে গিয়েছিলেন ওই ছয়জন। ট্রাকচালকের সঙ্গে বাগ্্বিতণ্ডায় সময় কোনাবাড়ী থানার টহল পুলিশের একটি দল তাদের আটক করে ডাকাতির প্রস্তুতি মামলা দিয়েছে। অথচ তাদের মধ্যে একজন আনসার সদস্য ও তিন কলেজছাত্র রয়েছেন। ওই ট্রাকের চালকও বলছেন, তার গাড়ি আটকিয়ে যুবকরা ক্ষতিপূরণ বাবদ টাকা দাবি করেছিলেন। অবশ্য পুলিশ বলছে, তারা গোপন সংবাদের ভিত্তিতেই ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ওই ছয়জনকে আটক করেছে। যদিও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে ঘটনার যে সময় জানা গেছে তার সঙ্গে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা সময়ের কয়েক ঘণ্টার ব্যবধান রয়েছে।
অভিযুক্ত তিন কলেজছাত্রের পরিবারের সদস্যরা জানান, সম্প্রতি গাজীপুর মহানগরীর বাঙ্গালগাছ এলাকার বাসিন্দা মো. সোহেল উদ্দিন একটি পুরনো প্রাইভেট কার কেনেন। ওই কারের চালক ১৫ জানুয়ারি রাত ১০টার দিকে সেটি নিয়ে বাইরে গেলে একটি ট্রাকের সঙ্গে দুর্ঘটনায় পড়েন। এ সময় ওই চালক তার বন্ধু আনসার সদস্য মজিবর রহমান খানকে ফোনে বিষয়টি জানান। পরে মজিবর রহমান কলেজছাত্র মো. মোবারক হোসেন দীপু (২১), মুরাত্তির খান মুনাজ্জী (১৯) ও আলী হোসেন (২০) এবং স্থানীয় কাজিম হোসেন হৃদয় (২৩) ও সাব্বির হোসেনকে (২১) নিয়ে একটি মাইক্রোবাসে করে কোনাবাড়ী যান। সেখানে ‘অভিযুক্ত’ ট্রাকের চালকের সঙ্গে তাদের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে কোনাবাড়ী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের আটক করে। পরে ডাকাতির প্রস্তুতির মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়।
কলেজছাত্র মোবারক হোসেন দীপুর বাবা লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমার নিরীহ ছেলেকে পুলিশ মিথ্যা মামলার আসামি করে তার জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছে। দীপু এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ছেলেকে আটকের পর পুলিশ আমাদের ফোন পর্যন্ত দেয়নি। তাদের পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার আনসার সদস্য মজিবর রহমানের মা মোছা. মজিরন বেগম বলেন, ‘১৫ জানুয়ারি মজিবর তার পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে শহরে শীতের কাপড় কিনতে যায়। রাতে রেললাইন পাহারার ডিউটিতে যাওয়ার কথা ছিল। একটি দুর্ঘটনার ফোন পেয়ে কোনাবাড়ী যাওয়ার পর তার মোবাইল বন্ধ পাই।’
কলেজছাত্র মুরাত্তির খান মুনাজ্জীর মা নাদিরা বেগম বলেন, তার ছেলে শহরের একটি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। পুলিশ তার ছেলের কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। থানা থেকে তাদের ফোনও দেয়নি কেউ।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এক সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক মো. শাহীন হোসেন বলেন, ‘ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে একটি মাইক্রোবাসে কয়েকজন যুবক ও ট্রাকের চালকের কথা-কাটাকাটি হয়। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে ওই যুবকদের আটক করে নিয়ে যায়। অবশ্য মামলার এজাহারে ঘটনার সময় ১৬ জানুয়ারি রাত দেড়টা বলে উল্লেখ করেছেন মামলার বাদী কোনাবাড়ী থানার এসআই মো. রোকনুজ্জামান সরকার।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ১৬ জানুয়ারি রাত দেড়টার দিকে কোনাবাড়ী নতুন বাজারে অবস্থানকালে পুলিশ টাঙ্গাইল টু গাজীপুরগামী মহাসড়কের ফ্লাইওভারের নিচে ‘পুলিশ পরিচয়’ দিয়ে ডাকাতির প্রস্তুতির গোপন খবর পায়। পরে সেখান থেকে ওই ছয়জনকে আটক করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি ডেগার ও ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে ট্রাকচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘একটি মাইক্রোবাস তার ট্রাকের গতিরোধ করে। পরে ওই মাইক্রোবাসের আরোহী বলতে থাকেন, ট্রাকটি একটি প্রাইভেট কারকে ধাক্কা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তারা ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪০-৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। একপর্যায়ে যুবকরা তার গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে যান। তাকেও মাইক্রোবাসের ভেতরে নিয়ে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে থাকেন। পরে টহলরত পুলিশ এসে তাদের আটক করে নিয়ে যায়।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোনাবাড়ী জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার আসাদুজ্জামান বলেন, অভিযুক্তরা পুলিশ পরিচয় দিয়ে ডাকাতির প্রস্তুতি নেওয়ার সময় টহল পুলিশ তাদের আটক করেছে। বিষয়টি পুলিশ তদন্ত করছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কোনাবাড়ী থানার এসআই আবুল কাসেম বলেন, আসামিদের শনিবার এক দিনের রিমান্ডে আনা হয়েছিল। রবিবার তাদের আদালতে পাঠানো হলে আদালত কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।