শিক্ষকের কর্নিয়া দানে চোখের আলো ফিরল দুজনের

সদ্য প্রয়াত নেত্রকোনা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক সুভাষ চন্দ্র রায়ের দান করা কর্নিয়ায় আলো ফিরে পেয়েছেন দুজন। এই শিক্ষক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) মরণোত্তর দেহদান করেন। এরপর তার দুটি কর্নিয়া দুজনের চোখে প্রতিস্থাপন করেন চিকিৎসকরা।

গতকাল বুধবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগের প্লাস্টিনেশন ল্যাবে এই মরণোত্তর দেহ গ্রহণ করেন বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকরা জানান, সুভাষ চন্দ্র রায় সিভিয়ার অ্যানিমিয়া স্ট্রোক ইরোসিভ গ্যাসট্রাইটিস সমস্যায় ভুগছিলেন। গত ১৯ জানুয়ারি স্বজনরা তাকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান। পরদিন মারা যান তিনি। মৃত্যুর আগেই মানুষের কল্যাণে নিজের দুটি কর্নিয়া ও আইবলসহ মরণোত্তর দেহদান করেছিলেন এই শিক্ষক। মৃত্যুর পর বিএসএমএমইউর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্য তার দুটি কর্নিয়া সংরক্ষণ করেন।

পরদিন ২১ জানুয়ারি বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধানে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসকরা কর্নিয়া দুটি দুই রোগীর চোখে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিটি অপথালমোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শীষ রহমান নেত্রকোনার ৬২ বছর বয়সী সুবের আলী নামে এক রোগীর চোখে একটি এবং চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রাজশ্রী দাস পটুয়াখালীর ৫২ বছরের জাহাঙ্গীর আলম নামে আরেক রোগীর ডান চোখে প্রতিস্থাপন করেন।

সুভাষ চন্দ্রের দেহ গ্রহণের সময় উপাচার্য এই মহৎ উদ্যোগের প্রশংসা এবং তার বড় ছেলে তিতাস রায় ও ছোট ছেলে পিয়াস রায়সহ পরিবারের সবার প্রতি এই ত্যাগের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

উপাচার্য বলেন, নেত্রকোনার সরকারি কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল অধ্যাপক সুভাষ চন্দ্র রায় সচেতন নাগরিক ছিলেন। তাই তিনি মরণোত্তর দেহদান করে গেছেন। তাদের মতো মানুষ সচেতন হলে ভবিষ্যতে অঙ্গ সংযোজনের সমস্যা থাকবে না।

এ ব্যাপারে সুভাষ চন্দ্র রায়ের ছোট ছেলে পিয়াস রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাবার দেহদানের বিষয়টির অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। কারণ প্রথাগতভাবে একজন মানুষের মৃত্যুর পর ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যা যা করার বিধান আছে, সেসবই করা হয়। কিন্তু আমরা ও আমাদের বাবা এ ব্যাপারে সহমত ছিলাম যে মরণোত্তর দেহদান করা হবে। সেটাই হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, বাবা বিজ্ঞানের শিক্ষকও। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক ছিলেন। তার ওই চিন্তা ছিল যে, শুধু চোখ কেন, আর কোনো অঙ্গও যদি মানুষের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা যায়, তিনি সেটা করে যাবেন। সৌভাগ্য ক্রমেই সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। দুজনের চোখে দুটি কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। রেটিনাসহ চোখের আরও কিছু অংশ আরও কিছু মানুষের দেহে প্রতিস্থাপন করা হবে।

সুভাষ চন্দ্র রায়ের দুই সন্তান। বড় ছেলে তিতাস রায় ঢাকায় ব্র্যাক ব্যাংকে ও ছোট ছেলে পিয়াস রায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে কর্মরত। বাবা, মা ও নিজের দেহদানের কাগজপত্র গত নভেম্বরের শুরুতেই সম্পন্ন করেন পিয়াস রায়। তার বাবার বয়স ছিল ৮১ বছর। মা দেবী রায়, গৃহিণী।

সুভাষ চন্দ্র রায় ও মা দেবী রায় ঢাকায় ছেলেদের কাছেই থাকতেন। ১৯ জানুয়ারি সকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন সুভাষ চন্দ্র রায়। তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর সেদিন রাত ২টা ৪৫ মিনিটে মারা যান।  

পিয়াস রায় বলেন, আজ (গতকাল) অফিশিয়ালি মরদেহ গ্রহণ করেছে বিএসএমএমইউ কর্র্তৃপক্ষ। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সৎকার কাজ ছাড়া শ্রাদ্ধসহ বাবার আত্মার শান্তির জন্য সবকিছু করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগে মরণোত্তর দেহদানকালে সুভাষ চন্দ্র রায়ের দুই ছেলেসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

চিকিৎকসরা জানান, পরে সুভাষ চন্দ্র রায়ের মরদেহটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানাটমি বিভাগে সংরক্ষণ করা হয়। এটি শিক্ষণ- প্রশিক্ষণ ও গবেষণাকাজে ব্যবহার করা হবে। মরণোত্তর দেহদানের অনুমতিপত্র অ্যানাটমি বিভাগের চেয়ারম্যানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মরদেহের এমবামিং প্রক্রিয়া শুরুর সময় মরদেহের যথোচিত সম্মান ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য শপথ গ্রহণ করা হয়।

সুভাষ চন্দ্র রায়ের জন্ম ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৩ সালে। মৃত্যুর আগে ঢাকায় বাংলাদেশ নোটারি পাবলিক কার্যালয়ে স্বজ্ঞানে ও কারও প্ররোচনা ছাড়াই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকার করেন। সুভাষ চন্দ্র রায়ের পরিবারের অন্য চার সদস্যের মধ্যে স্ত্রী দেবী রায় ও ছোট ছেলে পিয়াস রায় ইতিমধ্যেই মরণোত্তর দেহদান করেছেন। বড় ছেলে তিতাস রায়ও ভবিষ্যতে দেহদান করবেন বলে জানান পিয়াস।