জীবনে চলার পথে বিষন্নতা ও মানসিক অবসাদের মুখোমুখি হননি, এমন মানুষ বেশ কম। আমাদের জীবনযাপনের সঙ্গে ভীষণভাবে জড়িয়ে রয়েছে মানসিক অবসাদ। প্রতিদিনের একঘেয়েমি রুটিনে কাজের শেষে কখনো কখনো চেপে বসে ক্লান্তি। আর এভাবেই একদিন হঠাৎ অবসাদ আসে, বিষন্নতা ভর করে মন জুড়ে। এই অবসাদ থেকে মুক্তির উপায়গুলোর মধ্যে খুব কার্যকরী একটি উপায় হতে পারে যোগব্যায়াম। নতুন নতুন যোগা শুরু করতে চান যারা তাদের জন্য রয়েছে বেশ সহজ কিন্তু কার্যকরী কিছু যোগাসন।
বালাসন
বালাসন সাধারণত মন ও দেহকে রিল্যাক্স করতে সবচেয়ে উপযোগী আসন। পিঠ ও ঘাড়ের ব্যথা কমাতেও ফলপ্রসূ এবং হজমেও সাহায্যকারী।
আসনে যাওয়ার নিয়ম
এ ক্ষেত্রে প্রথমে হামাগুড়ি দেওয়ার মতো পজিশনে যান। গোড়ালির ওপর নিতম্ব থাকবে। দুই হাত শরীরের দুই পাশে নিশ্চল রাখতে হবে। আস্তে আস্তে প্রশ্বাস নিন এবং ঘাড়ের ভার ছেড়ে দিন। মেরুদন্ড লম্বা করুন এবং শরীর প্রসারিত করুন। নিঃশ্বাস ছাড়ুন এবং ধীরে ধীরে নিতম্ব থেকে সামনের দিকে ঝুঁকুন। দুই হাঁটু প্রসারিত করার সময় পায়ের বুড়ো আঙুলদ্বয় স্পর্শ করে থাকবে। কপালকে মেঝের সঙ্গে ঠেকিয়ে রাখুন এবং ঘাড় ও চোয়ালের ভর ছেড়ে দিন। এভাবে কিছুক্ষণ থেকে আবার শুরুর পজিশনে ফিরে যেতে পারেন এবং এভাবেই কয়েক রাউন্ড করতে পারেন।
হলাসন
হলাসন শরীর ও মনকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করে। এই আসনে সর্দি-কাশি, কানের যন্ত্রণা উপশম হয়। এ ছাড়া লো ব্লাড প্রেশার, কানে কম শোনা ইত্যাদি রোগের জন্যও হলাসন উপযোগী।
আসনে যাওয়ার নিয়ম
এই আসনটি করতে চিত হয়ে শুয়ে পড়ুন এবং দুই হাত শরীরের দুই পাশে এমনভাবে রাখুন যেন হাতের তালু মেঝের সঙ্গে থাকে। প্রশ্বাস নিয়ে শরীরের সব ভর মেঝেতে ছেড়ে দিন। এবার স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে নিতে দুই পা ৯০ক্ক কোণে ওপরে তুলুন। দুই হাতের সাহায্যে নিতম্ব ও পিঠ মেঝে থেকে তুলতে থাকুন। দুই পা ধীরে ধীরে ১৮০ক্ক-তে ঘুরিয়ে আনতে থাকুন, যতক্ষণ না পদদ্বয় মাথার ওপর দিয়ে মেঝে স্পর্শ করে। খেয়াল রাখুন, আপনার পিঠ যেন মেঝের সঙ্গে লম্বভাবে অবস্থান করে। পা মেঝেতে স্পর্শরত অবস্থায় কিছুক্ষণ থাকুন। এরপর আস্তে আস্তে আগের অবস্থায় ফিরে আসুন।
সেতুবন্ধাসন
এই যোগাসনটি মস্তিষ্ককে শান্ত করে এবং দুশ্চিন্তা ও অ্যাংজাইটি কমাতে সাহায্য করে। এই আসনরত অবস্থায় দেহ দেখতে অনেকটা সেতু বা ব্রিজের মতো লাগে বলে একে বলা হয় সেতুবন্ধাসন।
আসনে যাওয়ার নিয়ম
এই আসনটির জন্য প্রথমে চিত হয়ে শুতে হবে। এরপর দুই হাঁটু মুড়িয়ে নিন। পিঠ থেকে ঘাড় পর্যন্ত অংশ ধীরে ধীরে ওপরের দিকে তুলুন। কোমরের দিক দুই হাত দিয়ে ঠেকিয়ে রাখুন। মাথা, ঘাড় ও কাঁধ মাটিতে থাকবে। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখুন। এভাবে ৬ থেকে ৮ সেকেন্ড আসনে অবস্থান করুন। পরে স্বাভাবিক অবস্থায় এসে সামান্য বিশ্রাম নিন। তারপর আবার আসনে যান। এভাবে প্রথম দিকে ৪ বার করে এবং পরে ৬ বার পর্যন্ত অভ্যাস করতে পারেন।
অধোমুখশ্বানাসন
শরীরের বেশ কিছু সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি অধোমুখশ্বানাসন মনকে শান্ত রাখতে এবং দুশ্চিন্তা কমাতে সাহায্য করে। মাথা যন্ত্রণা, অনিদ্রা ও ক্লান্তি দূর করে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনও বাড়িয়ে তোলে।
আসনে যাওয়ার নিয়ম
দুই পায়ের মধ্যে কোমরের সমান ব্যবধান রেখে নতজানু হয়ে বসুন বা উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে পারেন। হাত দিয়ে মাটিতে চাপ দিয়ে কোমরের অংশ ওপরের দিকে তুলুন। এ সময় দুই তালু, কনুই ও গোড়ালি টানটান থাকবে। হাত, পা ও কোমরের পজিশন অনেকটা ইংরেজি অ অক্ষরের মতো হবে। আস্তে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়ুন এবং হাঁটু মুড়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে থাকুন।
শবাসন
যোগাসনের মধ্যে সব থেকে সহজ হওয়ায় অনেকেই যোগার শুরুতে শবাসন করে থাকেন। শরীর ও মনকে রিল্যাক্স করতে শবাসন কার্যকরী।
আসনে যাওয়ার নিয়ম
প্রথমে পিঠের ওপর ভর দিয়ে শুতে হবে। তারপর দুই হাত দুপাশে রেখে দুই পা সোজা করে রাখুন। হাতের তালু ওপরের দিকে থাকবে। স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে হবে। এক সময় শরীর ভারী হতে হতে ভর ছেড়ে দেবে। শরীরের সব পেশি রিল্যাক্স করুন। এ সময় চোখ বন্ধ করে মস্তিষ্কের ওপর লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। কিছু সময় এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর হাত ও পায়ের আঙুল ধীরে ধীরে নড়াতে পারেন। চোখ বন্ধ রাখা অবস্থায়ই চোখের মণি আস্তে আস্তে ঘোরাতে পারেন। এভাবে ৫ থেকে ১৫ মিনিট এই পজিশনে থেকে আরাম করুন।
যা জানতে হবে
যোগাসন করার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি । নয়তো বিভিন্ন রকমের সমস্যা হতে পারে
একবারে কখনোই ৬-৭টির বেশি আসন করা উচিত নয়। একেকটি আসন বা মুদ্রা অভ্যাসের পর অবশ্যই প্রয়োজন মতো শবাসনে বিশ্রাম নিতে হবে। কোনো শ্রমসাধ্য কাজ বা ব্যায়ামের পর বিশ্রাম নিয়ে তবেই যোগ ব্যায়াম করা উচিত।
পাতলা কম্বল বা যোগা ম্যাটের ওপর যোগাসন অভ্যাস করা উচিত।
যোগাসন অভ্যাসের সময় আঁটসাঁট পোশাক পরা উচিত নয়। কারণ এতে রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
যোগাসন চলাকালীন কথা বলা বা অমনোযোগী হওয়া একদমই উচিত না। কারণ, যোগাসনের মূল মন্ত্রই হলো দেহের সঙ্গে মনের একাগ্রতা স্থাপন করা।
পিরিয়ডের সময় যোগাসন বন্ধ রাখাই ভালো। তবে একান্তই করতে চাইলে ধ্যানাসন বা শবাসন করা যেতে পারে।
পুরোপুরি ভরপেট কিংবা একেবারে খালি পেটে যোগাসন না করাই ভালো।