স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত গডফাদারদের নির্দেশ ও ‘নিয়ম’ মেনে কয়েকটি জলদস্যু দল সাগরে ডাকাতি করছে। ছয় ডাকাতকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল শুক্রবার র্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডাকাতরা গডফাদারদের ট্রলারে করে সাগরে গেলেও ডাকাতিতে ব্যবহার করে সাধারণ জেলেদের ট্রলার। এর জন্য প্রথমে তারা শক্তিশালী ইঞ্জিনের ট্রলার টার্গেট করে। পরে সেই ট্রলারের জেলেদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বন্দি করে কিংবা অন্য কোথাও নামিয়ে দেয়। পরে অন্যান্য ট্রলারে ডাকাতি করে।
র্যাব জানিয়েছে, তীরে ফিরে ডাকাতির মালামাল বিক্রি করে টাকা ভাগ করে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে গডফাদার ও ডাকাতরা ৪০ শতাংশ হারে টাকা নেয়। বাকি ২০ শতাংশ খরচ হিসাবে ধরা হয়।
২৩ থেকে ২৫ জানুয়ারি রাত পর্যন্ত সাগরে অভিযান চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র, লুটের মালামালসহ ৬ ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। গতকাল শুক্রবার কক্সবাজার ফিশারিঘাটে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচএম সাজ্জাদ হোসেন।
এইচএম সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী ও বাঁকখালী মোহনায় অভিযান চলানো হয়। এতে ৩টি দেশে তৈরি এলজি, ১৪টি কার্তুজ, ৩টি দা, ২টি স্মার্ট ফোন এবং ৮টি বাটন ফোন জব্দ করা হয়েছে।
যে ছয়জনকে আটক করা হয়েছে তারা হলেন কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশখালী ইউনিয়নের মাহমুদ উল্লাহর ছেলে জলদুস্য সরদার বাদশা (২৭), একই ইউনিয়নের মুসালিয়া সিকদারপাড়ার রহিম উল্লাহর ছেলে মো. মারুফুল ইসলাম (২২), দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়নের জুলেখা বিবি গ্রামের মো. ইসমাঈলের ছেলে রায়হান উদ্দিন (২২), একই ইউনিয়নের পেচারপাড়া গ্রামের মৃত কবির আহমদের ছেলে এরশাদুল ইসলাম (২০) ও সাহারুম সিকদারপাড়ার মো. ইউনুছের ছেলে মো. রাফি (১৯) এবং চট্টগ্রাম ইপিজেড থানা এলাকার নারিকলতলার সেইলর কলোনির মো. আবু বক্করের ছেলে মো. আল-আমিন (২৫)।
র্যাব কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ২২ জানুয়ারি কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজুম ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. বেলাল হোসেনের মালিকানাধীন ট্রলারে বাঁকখালীর মোহনায় ডাকাতি করে একদল জলদুস্য। এই ঘটনায় র্যাবের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন ট্রলার মালিক। ক্ষতিগ্রস্তের অভিযোগ পেয়ে ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যা থেকে র্যাব সাগরে অভিযানে নামে। এরই ধারাবাহিকতায় ২৫ জানুয়ারি রাতে বঙ্গোপসাগরের বাঁকখালী নদীর মোহনায় একটি ইঞ্জিনচালিত ট্রলারের গতিরোধ করার চেষ্টা করে র্যাব। এ সময় ওই ট্রলার থেকে র্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। র্যাব পাল্টা গুলি করলে পাঁচ-ছয়জন জলদস্যু সমুদ্রে লাফ দিয়ে পালিয়ে যায়। একই সময়ে অস্ত্র, গোলাবারুদ, ডাকাতি করা মাছ এবং অন্যান্য মালামালসহ ছয় ডাকাতকে আটক করা হয়।
আটক ডাকাতদের বরাত দিয়ে র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, এ দলটিসহ কয়েকটি ডাকাত দলের গডফাদার পেকুয়ার রাজাখালীর নুরুল আবছার বদু, জালাল আহমদ ও কুতুবদিয়ার ইসহাক ওরফে ইসহাক মেম্বার। তারা এক সপ্তাহ আগে নিজেদের ফিশিং ট্রলারে করে জলদস্যুদের সাগরে পাঠায়। গডফাদারদের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথমে দলটি পেকুয়ার রাজাখালীর কালু কোম্পানির ট্রলার ডাকাতি করে মাঝিমাল্লাদের বেধড়ক পিটিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নামিয়ে দেয়। পরে জলদস্যুরা ওই ট্রলার নিয়ে ডাকাতি শুরু করে, যাতে গডফাদারদের চিহ্নিত করতে না পারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তিনি বলেন, গডফাদারদের কাজ হলো অস্ত্র-গুলি এবং ট্রলারের জোগান দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাগরে অভিযানে যাচ্ছে কি না, তা তদারকি করা। এ ছাড়া জলদস্যুদের ফিরে আসার সময় জানানো, ব্যবসায়ী হিসেবে ডাকাতির মাছ ও মালামাল বিক্রি করা। আর জলদস্যুরা সাগরে গিয়ে ডাকাতি করে মাছ এবং মালামাল বিক্রি করে যে টাকা পায় তার ৪০ শতাংশ গডফাদারদের, ২০ শতাংশ তেল খরচ এবং যারা সশস্ত্র ডাকাতি করেছে তারা ৪০ শতাংশ। এভাবেই ডাকাতির টাকা ভাগ হয় তাদের মধ্যে।
র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক বলেন, আটক আল-আমিনের রেকর্ডপত্র যাচাই করে দুটি এবং এরশাদের নামে একটি মামলার তথ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া গডফাদার নুরুল আবছার বদু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত জলদস্যু। তার বিরুদ্ধে ডাকাতিসহ কমপক্ষে ৩০টি মামলা রয়েছে। জালাল আহমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলাসহ অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে এবং মো. ইসহাক ওরফে ইসহাক মেম্বারও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত জলদস্যু। তার বিরুদ্ধেও ডাকাতির মামলাসহ অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। তা ছাড়া আটক ডাকাত দলটির সরদার মো. বাদশা একজন কুখ্যাত জলদস্যু। কক্সবাজার অঞ্চলে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত জেলে সম্প্রদায় ও অন্যদের আতঙ্কের অপর নাম বাদশা ডাকাত।
তিনি আরও বলেন, ধৃত ও পলাতকদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা করে কক্সবাজার সদর থানায় সোপর্দ করা হয়েছে।