বিআরটিসি সুসংবাদ

১৫ বছর আগেও বলা হতো নীতিবহির্ভূত কিছু সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনায় সরকার নিয়ন্ত্রিত বিআরটিসি ডুবতে বসেছে। ঢাকার রাস্তায় শুধু নয়, সারা দেশেই বেসরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস কোম্পানি লাভবান হচ্ছে। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় নেই প্রতিষ্ঠানটি। কারিগরদের সংকটের কারণে ভারী মেরামত ও হালকা মেরামতের জন্য বাসগুলো বসা থাকত। ডিপোতে কাজের কোনো পরিবেশ ছিল না। কর্মচারীদের বেতন বকেয়া থাকত মাসের পর মাস। কিন্তু এখন কোনো বাস মেরামতের অপেক্ষায় বসে থাকে না। মূল কারণ হচ্ছে, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ কারিগরের পাশাপাশি কর্মচারীদের আর্থিক বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। বর্তমানে মাসের ১/২ তারিখের মধ্যেই বেতন পাওয়া যাচ্ছে। মাসিক বেতন ছাড়াও রয়েছে উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, পারফরম্যান্স ইনসেনটিভ, গ্রুপ বীমা, দূরত্ব ভাতা, মোবাইল ভাতা, দীর্ঘমেয়াদি চাকরি হলে পেনশন সুবিধা, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিসহ অন্যান্য সুবিধা। এ ছাড়াও রয়েছে বিনা খরচে একক আবাসন সুবিধা।

এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শনিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ‘অচল গাড়ি সচল হয়ে বাড়ে রাজস্ব’ প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে একসময় ভুতুড়ে পরিবেশ থাকলেও এখন দিন-রাতে ব্যস্ত সময় পার করেন ঢাকার তেজগাঁও ও গাজীপুরের প্রধান মেরামত কারখানার শ্রমিকরা। করপোরেশনের চালিকাশক্তি হিসেবে বাস ও ট্রাকগুলোকে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করে সচল রাখছে এ কারখানাগুলো। গাড়ি মেরামতের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় ও দক্ষ কারিগর নিয়োগের ফলে দ্রুততার সঙ্গে গাড়িগুলো ভারী মেরামত ও হালকা মেরামত কাজ শেষ করে রুটে প্রেরণ করা হচ্ছে। এতে ডিপোর আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিআরটিসি লাভবান হচ্ছে। আগে কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানায় বাস ও ট্রাকের জটিল ও ভারী মেরামতের কাজ করা হতো না। এখন কারখানাগুলোতে ভারী মেরামতের কাজ হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি বাসকে ডেন্টিং ও পেইন্টিং করে দৃষ্টিনন্দন করার কাজও হচ্ছে। পুরনো ও অদক্ষ জনবলকে দক্ষ করার জন্য সমন্বিত কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানায় বিভিন্ন ব্যাচে প্রায় ২৭০ জনকে ইঞ্জিন, ইলেকট্রিক সিস্টেম, ডেন্টিং, পেইন্টিং বিষয়ে ও এসি সিস্টেমে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কারিগরে পরিণত করা হয়েছে।  গাজীপুরে সমন্বিত কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানাটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ৩ বছর আগেই চালু করা হয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ও সমন্বিত মেরামত কারখানার মাধ্যমে করপোরেশনে নিয়োজিত গাড়িগুলোকে যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে, গাড়িবহরে যুক্ত রেখে নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবহন নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। এগুলো বিআরটিসির বহরে যুক্ত করে রাজস্ব বাড়ানো হচ্ছে।

এ ছাড়া মেট্রোরেলের যাত্রী পরিবহনের জন্য বিআরটিসি ও ডিএমটিসিএলের মধ্যে গঙট স্বাক্ষরিত হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মেট্রোরেলের যাত্রী পরিবহন সেবা চলমান রয়েছে। ৬ শতাধিক গাড়ি ভারী মেরামত করে বিআরটিসির গাড়িবহরে সংযুক্ত করে রাজস্ব বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বর্তমানের প্রত্যেক ডিপো/ইউনিটে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক প্রধান কার্যালয় থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। বর্তমানে ৪টি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ও ২০টি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মাধ্যমে বিআরটিসি ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একসময় প্রতি বছর বড় অঙ্কের লোকসান করেছে সংস্থাটি। এমনকি ঋণের কিস্তিও (ডিএসএল) অনেক সময় পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। তখন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক সামছুল হক বলেছিলেন, অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে বিআরটিসি। পাশাপাশি সঠিক তদারকি না থাকায় সংস্থাটি অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সংস্থাটির লোকসানের বোঝা কমাতে নিজস্ব অর্থায়নে সামান্য ত্রুটির কারণে ফেলে রাখা বাসগুলো মেরামত করার পরামর্শ দেন তিনি।

বর্তমানে পরিস্থিতি বদলে গেছে। বিআরটিসির সমন্বিত কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানার জেনারেল ম্যানেজার ফাতেমা বেগম জানাচ্ছেন, ‘মেরামত কারখানাটিতে মাসের পর মাস, ক্ষেত্রবিশেষে বছরও পার হয়ে যেত, বেতন-ভাতা বকেয়া ছিল। চারদিকে হাহাকার আর জীর্ণ প্রতিষ্ঠান। আরও অনেক সমস্যা ছিল। এখন প্রধান কার্যালয়সহ ডিপো ইউনিটের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বেতন-ভাতা নিজস্ব আয় থেকে প্রতি মাসের প্রথম দিনে পরিশোধ করা হচ্ছে। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আগের থেকে কাজের গতি অনেক বেড়েছে। এর সুফল হিসেবে এই কারখানায় অচল গাড়িও সচল হয়ে যাচ্ছে।’ আমরা আশা করব, বিআরটিসির এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে।