বাড়ছে রোগী নেই কর্মকৌশল

দেশে বর্তমানে ১৮ থেকে ২০ লাখ মানুষ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে ভুগছে। প্রতিবছর ক্যানসারে নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে আরও দেড় লাখের মতো মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, বাংলাদেশে ২০২২ সালের তুলনায় ২০৫০ সালে দ্বিগুণেরও বেশি নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হতে পারে।

প্রতিবছর ক্যানসারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও ক্যানসার চিকিৎসা ও যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা রয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলেও ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে কোনো নীতিমালা নেই। ক্যানসার নিয়ে বড় কোনো গবেষণাও হচ্ছে না। ক্যানসার আক্রান্ত ও মারা যাওয়া রোগীদের কোনো পরিসংখ্যান নেই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে।

এমন প্রেক্ষাপটে আজ বিশ্ব ক্যানসার দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য, ‘ক্লোজ দ্য কেয়ার গ্যাপ’ অর্থাৎ ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবধান বন্ধ করুন। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। মহাখালী জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ক্যানসারবিষয়ক আলোচনা ও সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত অংশগ্রহণে মানববন্ধন ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি। পাশাপাশি জেলা-উপজেলা পর্যায়েও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালিত হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসার যদি প্রাথমিক স্তরে শনাক্ত করা যায়, তাহলে সব ক্যানসারই সারিয়ে তোলা সম্ভব। যদি অনেক পরে ধরা পড়ে, তখন আর সারানো সম্ভব হয় না। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্যানসার প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল তৈরি করেছিল, যা ২০১৪ সালে হালনাগাদ করার কথা ছিল। কিন্তু এরপর ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এর বাস্তবায়নে অগ্রগতি নেই। জাতীয় কর্মকৌশলে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১. প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিরোধের মাধ্যমেই ক্যানসারের প্রকোপ হ্রাস, ২. মৃত্যুহার কমাতে কার্যকর স্ক্রিনিং এবং প্রাথমিক শনাক্তকরণ, ৩. কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করা, ৪. ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারকে সহায়তার মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, ৫. পুনর্বাসন এবং উপশমকারী যত্ন, ৬. ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে পরিষেবা সরবরাহের উন্নতি, ৭. পরিকল্পনা, সমন্বয়, পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়ন ও ৮. গবেষণা ও নজরদারির মাধ্যমে ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ক্যানসার আক্রান্তের যে হার তা উদ্বেগজনক। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা বাড়ানো, জনসাধারণকে সচেতনতা ও চিকিৎসাসেবার আওতায় নিয়ে আসার বিকল্প নেই। ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করতে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি এ নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন। যদিও দেশে ক্যানসার বিষয়ে বড় আকারে কোনো গবেষণা নেই। শুধু মেডিকেল শিক্ষার্থীদের নিজস্ব পড়াশোনার প্রয়োজনে কিছু গবেষণা হয়।

বিষয়টি স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুধু ক্যানসার নয় প্রায় সব রোগ নিয়েই দেশে গবেষণা কম হচ্ছে। বিষয়টি সরকারের ভাবনায় রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র কয়েক দিন হলো, চলতি বছর থেকে আমার একটা পরিকল্পনা রয়েছে চিকিৎসা খাতে গবেষণা বাড়ানো নিয়ে। রোগ নিয়ে গবেষণা ছাড়া প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ কিংবা ভালো চিকিৎসা সম্ভব নয়।’

ডা. সামন্ত লাল জানান, ক্যানসার প্রতিরোধে জাতীয় যে কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা হালনাগাদ করে যুগোপযোগী ও কার্যকরের কথা।

দ্রুত শনাক্তকরণ এবং কার্যকর চিকিৎসায় ক্যানসার নিরাময় সম্ভব। ঝুঁকির কারণ এড়ানো এবং প্রতিরোধের কৌশল প্রয়োগ করে রোগটি প্রতিরোধ করা যায়। যদিও চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতায় প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত হচ্ছে না। অধিকাংশ রোগী তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে হাসপাতালে আসছেন, দেরিতে ক্যানসার শনাক্ত মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

চিকিৎসকদের মতে, দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা বাড়ার কারণ বিভিন্ন ধরনের দূষণ বৃদ্ধি, খাদ্যে ভেজাল, শাকসবজি ফলমূলের পরিবর্তে জাংক ফুড বেশি খাওয়া, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, তামাক ও অ্যালকোহল গ্রহণ। নারীদের তুলনায় ক্যানসারে পুরুষরা বেশি আক্রান্ত হলেও নারীদের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। পুরুষরা ফুসফুস, প্রস্টেট, মুখগহ্বর, মলাশয় বা কলোরেক্টাল, পাকস্থলী ও লিভার ক্যানসারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে নারীরা স্তন, জরায়ুর, মুখগহ্বর ও থাইরয়েডের ক্যানসারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।

ঢাকা মেডিকেলের বহির্বিভাগে আসা ক্যানসার রোগীদের ১১ শতাংশ জরায়ু ক্যানসারের রোগী বলে জানিয়েছেন রেডিওথেরাপি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আলীয়া শাহনাজ। তিনি বলেন, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি), অল্প বয়সে গর্ভধারণ, ধূমপান, বহুগামিতা, দীর্ঘদিন জন্মনিরোধক বড়ি সেবন, বাল্যবিয়ে ও অপরিষ্কার থাকা নারীদের জরায়ু ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যানসার রোগীদের ডেটাবেস তৈরি করা খুব প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ক্যানসার রোগীর প্রকৃত সংখ্যা ও রোগের ধরন যেমন জানা যায়, তেমনি সঠিক পরিকল্পনাও নেওয়া যায়। ক্যানসার নিয়ে বাংলাদেশে গবেষণা কম। ফলে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা, আক্রান্ত ও মৃত্যুর কারণ নিয়ে কথা বলা কিংবা অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করা কঠিন হয়ে যায়।

চিকিৎসার সুযোগ কম : ১৭ কোটি মানুষের জন্য দেশে একটি মাত্র পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। ঢাকার মহাখালীতে এই হাসপাতাল ছাড়াও সরকারি পর্যায়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যানসারের চিকিৎসা হয়। তবে এগুলোতে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৭০টি ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র প্রয়োজন। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে ৯টি ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে কয়েকটি হাসপাতালে ক্যানসার চিকিৎসা হয়।

গত বছর দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর ক্যানসার (আইএআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় শয্যা আছে মাত্র ৫০০; অর্থাৎ একটি শয্যার বিপরীতে রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার। আক্রান্তের মধ্যে মাত্র ৫০ হাজার রোগীকে চিকিৎসা সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে। অন্যরা চিকিৎসাসেবার বাইরে থাকছে।

ক্যানসার নির্ণয়, চিকিৎসা সম্প্রসারণ ও বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার ওপর চাপ কমানো, চিকিৎসায় বিদেশনির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও চিকিৎসায় জনগণের ব্যয়ভার কমানোর লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে ক্যানসার চিকিৎসায় দেশের ৮টি বিভাগীয় শহরে ১০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার, যা ২০২২ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও অবকাঠামো নির্মাণের কাজই শেষ করা সম্ভব হয়নি।

প্রকল্প পরিচালক ডা. এস এম মাসুদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা একটা জটিল প্রকল্প। প্রথমে শুধু ক্যানসার হাসপাতাল ছিল। পরে কিডনি এবং হৃদরোগ যোগ হওয়ায় মাঝপথে আটকে গেছে। এ ছাড়া মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে সংশোধন করা লাগছে। যদি প্রথমেই তিনটি কাজ একসঙ্গে শুরু করা হতো এবং বারবার পরিবর্তন না করা লাগত, তাহলে এমন জটিলতা হতো না।’

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেছেন, ‘ক্যানসার চিকিৎসা বিকেন্দ্রীকরণে এই প্রকল্পটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর চট্টগ্রামে নির্মাণাধীন ক্যানসার হাসপাতালটি ঘুরে এসেছি। খুব দ্রুতই এই প্রকল্প শেষ করে কার্যক্রম শুরু করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করব।’