ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে তিনটি নদীর চারটি স্টেশনে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নীলফামারী, কুড়িগ্রামসহ বেশ কয়েকটি জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বা আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বাপাউবো জানিয়েছে, কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জের ছাতক পয়েন্টে বিপদসীমার ১৬ সেন্টিমিটার এবং সোমেশ্বরী নদীর পানি নেত্রকোনার কলমাকান্দা পয়েন্টে ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা, দুধকুমার ও তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এসব নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বা স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সুরমা, সারিগোয়াইন, কংশ, সোমেশ্বরী, ভুগাই ও জাদুকাটা নদীর পানিও বাড়ছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এসব নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি ঘটতে পারে।
পূর্বাভাসে বলা হয়, ব্রহ্মপুত্র নদ ও যমুনা নদীর পানি আগামী পাঁচ দিন পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে নদীগুলোর পানি সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলেও পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। সাঙ্গু নদীর পানি ইতিমধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী (গতকাল থেকে) একদিন পর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ি নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এদিকে উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে আবারও তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার মাত্র ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানির চাপ সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। পাউবো ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, তিস্তা নদীর পানি বেড়ে সকাল ৯টায় বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং পানি আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।
নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, সোমেশ্বরী নদীর পানি বৃদ্ধি আর পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার কলমাকান্দার খারনৈ ইউনিয়নের গজারমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একাংশ ভেঙে গেছে। নাজিরপুর ও লেংগুড়া ইউনিয়নের নলছাপ্রাবাজার, বালুচড়া উচ্চবিদ্যালয় সড়কের প্রায় ১০০ ফুট অংশ পানির স্রোতে ধসে গেছে। তবে সকাল থেকে বৃষ্টি না থাকায় ঢলের পানি নেমেও যাচ্ছে।
লেংগুড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান ভূঁইয়া জানান, নলছাপ্রাবাজার, বালুচড়া উচ্চবিদ্যালয় সড়কসহ ইউনিয়নের একাধিক স্থানে ঢলের তীব্র স্রোতে সড়ক ভেঙে গেছে। চেংনী নদীর পাড় ভেঙে প্রায় ৫০ একর ফসলি জমিতে বালু জমেছে। এতে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া শতাধিক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে এবং আমনের বীজতলাও বালু পড়ে নষ্ট হয়েছে। খারনৈ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওবাইদুল হক জানান, পাহাড়ি ঢলে গজারমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের কাঁচা সড়কও ভেঙে গেছে। আমনের বীজতলা এবং পুকুর মাছের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কুড়িগ্রামে বাড়ছে সব নদ-নদীর পানি কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের প্রভাবে কুড়িগ্রামের সবকটি প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার কোনো নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি, তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। ধরলা নদীর পানি কুড়িগ্রাম ও তালুকশিমুলবাড়ী পয়েন্টে এবং দুধকুমার নদের পাটেশ্বরী পয়েন্টে, ব্রহ্মপুত্র নদের নুনখাওয়া, হাতিয়া ও চিলমারী পয়েন্টে এবং তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
জোয়ারে ভেসে গেল দুই শতাধিক মহিষ : ভোলা প্রতিনিধি জানান, উজানের ঢল ও অস্বাভাবিক জোয়ারে ভোলার দৌলতখানে ভয়াবহ দুর্ভোগ নেমে এসেছে। প্রবল স্রোতে বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে প্রায় দুই শতাধিক মহিষ ও গবাদিপশু ভেসে গেছে। পানিতে তলিয়ে গেছে গোয়ালঘর, বসতঘর, খাদ্য। ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত খামারি ও পানিবন্দি মানুষের খোঁজ নিতে কেউ আসেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। ভেসে যাওয়া মহিষগুলোরও এখনো সন্ধান মেলেনি। গত শুক্রবার রাতের অস্বাভাবিক জোয়ারে উপজেলার মেঘনা নদীবেষ্টিত চর বৈরাগী, মেদুয়া, মদনপুর, চর হাজারী ও হাজিপুরসহ কয়েকটি চরাঞ্চলের মহিষের বাতান পানিতে তলিয়ে যায়। রাখালদের কিল্লাও ডুবে যাওয়ায় প্রায় দুই শতাধিক মহিষ স্রোতে ভেসে যায়। এতে খামারিদের প্রায় আড়াই কোটি টাকা ক্ষতি হয়ে হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মালিকদের মধ্যে রয়েছেন দৌলতখান পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বাবুল, আবুল বশির মেম্বার, হাজি আকবর, ইসমাইল, মোশাররফ মেম্বারসহ আরও অনেকে। এতে খামারিদের প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। দ্রুত মহিষগুলো উদ্ধারে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তারা।
এদিকে উজানের পানি বৃদ্ধি পেয়ে উপজেলার বেড়িবাঁধের বাইরে ভবানীপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড এবং সৈয়দপুর ইউনিয়নের ৬, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ড প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ছাদেক, আবুল কাশেমসহ একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, এখন পর্যন্ত কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি। অনাহার-অর্ধাহারে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের।