খুলনা মেডিকেল হাসপাতাল

রেডিওথেরাপি যন্ত্র ১২ বছর বাক্সবন্দি

সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে বাবাকে কেমোথেরাপি দিতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার বিভাগে এসেছেন সিদ্দিক গাজী। পরিবারের উপার্জনক্ষম তিনি ও তার দুই ভাই। তারা সবাই কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

সিদ্দিক গাজী বলেন, ছয় মাস আগে তার বাবা হুসাইন গাজীর (৭২) ক্যানসার ধরা পড়ে। তার বাবাকে ছয় মাসে ছয়বার কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল থেকে বলা হচ্ছে, কেমোথেরাপির পর এখন রেডিওথেরাপি দিতে হবে। সে জন্য ঢাকার সাভারে ইনাম মেডিকেল হাসপাতালে যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন, সেখানে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হবে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাবে ক্যানসার ইউনিটে কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না রোগীরা। ক্যানসারের চিকিৎসায় ২০১২ সালে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি রেডিওথেরাপি যন্ত্র দেওয়া হয়েছিল। ২৪ কোটি টাকা দামের যন্ত্রটির বাক্সও খোলা হয়নি।

খুমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. হুসাইন শারাফাত বলেন, যন্ত্রটি স্থাপনের জন্য যে অবকাঠামো ও যন্ত্রটি চালানোর মতো দক্ষ জনবল এই হাসপাতালে নেই। সে জন্য বাক্সবন্দি থেকে গেছে। তবে ১০০ শয্যার ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণকাজ চলছে। সেটি চালু হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০১৪ সালের ১৮ অক্টোবর রেডিওথেরাপি ও অনকোলজি বিভাগ (ক্যানসার ইউনিট) চালু হয়। ইউনিটে ৮টি শয্যা রয়েছে। বহির্বিভাগ হিসেবে পরিচিত এই ইউনিটে শুধু কেমোথেরাপি, নতুন রোগী দেখা ও ফলোআপ কার্যক্রম চলে।  এই ইউনিটে পাঁচজন চিকিৎসক ও তিনজন সেবিকা কর্মরত। প্রতি বছর সেখানে রোগীর চাপ বাড়ছে। বছরে গড়ে নতুন-পুরনো মিলিয়ে চার থেকে পাঁচ হাজারের মতো রোগী সেখানে সেবা নেয়।

সেবাপ্রার্থীরা বলছে, কেমোথেরাপি ছাড়া হাসপাতাল থেকে তেমন সহযোগিতা করা হয় না। রোগীদের সরকারিভাবে কোনো ওষুধ দেওয়া হয় না। প্রত্যেক রোগীকে নির্দিষ্ট কোম্পানির কেমোথেরাপির ওষুধের লিস্ট দেওয়া হয় চিকিৎসকের রুম থেকেই। লিস্টের নিচে দেওয়া ওই কোম্পানির প্রতিনিধির ফোন নম্বরে ফোন করে ওষুধ কিনতে হয়। তা ছাড়া কেমোথেরাপির পর অনেক রোগীরই রেডিওথেরাপি লাগে। কিন্তু রেডিওথেরাপির যন্ত্র চালু না করায় ঢাকা যেতে হয়। কেউ কেউ ভারতে চলে যায়।

লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত খুলনার মহেশ্বরপাশার বাসিন্দা অনামিকা রায়ের (৫৮) স্বজনরা বলেন, সরকারি হাসপাতাল হিসেবে কিছু ওষুধ পেলে রোগী ও তারা বেঁচে যেতেন। প্রতিবার কেমোথেরাপি দিতে বিভিন্ন জায়গা থেকে ধারদেনা করা লাগে। এ ছাড়া খুলনায় রেডিওথেরাপি হয় না। সেটি ঢাকা বা ভারতে গিয়ে করাতে অনেক টাকার দরকার হয়।

খুমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. হুসাইন শারাফাত বলেন, ক্যানসার রোগীদের জন্য হাসপাতালে আলাদা একটি ইউনিট রয়েছে সত্যি। তবে সেখানে শুধুই প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

বিশেষায়িত ক্যানসার হাসপাতাল : ১৭৫ কোটি ৭২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয়ে বিভাগীয় শহরে সরকারি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অঙ্গনে নির্মিত হচ্ছে ১০০ শয্যার একটি ক্যানসার হাসপাতাল। এই ভবনে শুধু ক্যানসার রোগীদের সেবাই নয়, কিডনি ও হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীরাও সেবা পাবে। ভবনে দুটি বেজমেন্ট, ১৫তলা ভবনসহ ১৭তলা পাইল ফাউন্ডেশন হবে। বেজমেন্ট-২ থেকে ৭ম তলা পর্যন্ত হবে ক্যানসার ইউনিট। এতে দরকারি চিকিৎসা সুবিধা ও সব যন্ত্রই থাকবে। ৮তলা থেকে ১১তলা পর্যন্ত হবে কিডনি ইউনিট। এখানে থাকবে কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট, কিডনি প্রতিস্থাপনের অপারেশন থিয়েটার, প্রতিস্থাপন-পরবর্তী চিকিৎসাব্যবস্থা ও আইসিইউ। আর ১২তলা থেকে ১৫তলা পর্যন্ত হবে হৃদরোগ ইউনিট। এই ইউনিটে থাকবে সিসিইউ, আইসিইউ, কার্ডিয়াক অপারেশন থিয়েটার, পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জারি ও ক্যাথ ল্যাব।

ভবনের কাজ বাস্তবায়ন করছে গণপূর্ত বিভাগ-১। এই বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমার বিশ্বাস জানান, ভবন নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গণপূর্ত বিভাগের চুক্তি হয়েছিল ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর। ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই মেয়াদে কাজ এগিয়েছে ৩৫ শতাংশ।

নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও নানা কারণে বাস্তবায়নকাজে অগ্রগতি কম। তবে বর্তমানে কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, বর্ধিত এই মেয়াদে কাজ শেষ হবে।