বাণিজ্যের অপেক্ষায় থাকেন প্রকাশকরাও

ক্রীড়া সাংবাদিক ও সাহিত্যিক দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের জন্ম বাগেরহাটের জেলার সাংদিয়া গ্রামে, ১৯৭৯ সালে। দেশের শীর্ষ কিছু সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছেন দুই দশক ধরে। পাশাপাশি ছোটগল্প এবং কিশোর সাহিত্য লিখেছেন।

ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। এর মধ্যে ‘মাশরাফি’, ‘সাকিব আল হাসান’, ‘নায়ক’ এবং ‘নন্দিত-নিন্দিত’ অন্যতম। এ ছাড়া দুটি সায়েন্স ফ্যান্টাসি এবং বেশ কয়েকটি কিশোর উপন্যাস লিখেছেন। লিখেছেন একটি নভেলা ‘দ্বিতীয় প্রেম, প্রথম খেলার আগে’। ছোটগল্পের সংকলন প্রকাশ হয়েছে দুটি কলপো গলপো এবং অটোগ্রাফ। কথা বলেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র।

আপনার কী কী বই আসছে বইমেলায়?

দেবব্রত মুখোপাধ্যায় : এবার বইমেলায় আমার একটাই বই আসছে ‘ডানাকাটা পরী’। এটাকে বলতে পারেন, আমার পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস। বলা যেতে পারে প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য প্রথম উপন্যাস। তাতে আবার অর্থ বদলে রগরগে হয়ে যায় বলে বলছি না। আসলে এর আগে আমি যে গোটা বিশেক বই লিখেছি, তার মধ্যে উপন্যাস ঠিক ছিল না। খেলার বই বেশি ছিল, কিশোর থ্রিলার ছিল, কিশোর উপন্যাস ছিল। এই প্রথম উপন্যাস লিখলাম। ভিলেজ পলিটিকস আর যাত্রাপালা উপন্যাসের প্রেক্ষাপট। আমি উপন্যাসটা নিয়ে বেশ রোমাঞ্চিত।

আপনার বই পাঠককে কেন পড়তে বলবেন?

দেবব্রত মুখোপাধ্যায় : কারণ, আমার বই পড়ার পর আপনাকে আর বেশি ভাবতে হবে না। হা হা হা...। না, আমি ঠিক জানি না, পাঠকের কারও বই কেন পড়া উচিত। আমি তো লেখার ইউএসপি বের করতে পারি না। মনে হয়, আমার লেখাটা যে কেউ পড়তে পারে। লেখার মধ্যে কঠিন শব্দের ঘনঘটা বা জটিল বাক্য নেই। ফলে যে কেউ চাইলে একবার পড়ে দেখতে পারেন।

বই পৌঁছানোর কোনো কৌশল কি আপনি অবলম্বন করেন?

দেবব্রত মুখোপাধ্যায় : আমি উদ্যোগ নিয়ে তেমন কিছু করি না। শুধু ফেসবুকে হইচই করার চেষ্টা করি। কেবল ‘মাশরাফি’ বইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক মিডিয়া কাভারেজের ব্যবস্থা করেছিলাম। তাতে সফলও হয়েছিলাম। এবার পরিচিতদের একটু কাভার ছাপা বা রিভিউ করার জন্য বলছি।

আমাদের বই প্রকাশ, প্রচার, আলোচনার প্রবণতা অনেকটা ফেব্রুয়ারি মাসকেন্দ্রিক। বছরের বাকি ১১ মাস কোনো খোঁজ থাকে না। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

দেবব্রত মুখোপাধ্যায় : এটা নিয়ে তো অনেক কথা হয়েছে। আমি আসলে একটা জিনিস বুঝি যে চাহিদা ছাড়া জোগান থাকবে না। আমাদের পাঠকের যদি ফেব্রুয়ারি মাস ছাড়া বই কেনার আগ্রহ না থাকে, প্রকাশকরা বাকি ১১ মাস বই করতে সাহস পাবেন না। তবে বিষয়টা কিন্তু এখন আর পুরো তেমন নেই। সময় সেবা প্রকাশনী সারা বছর রমরমা বই বিক্রি এবং প্রকাশ করত। এখন প্রথমা, বাতিঘর, পাঠক সমাবেশ সারা বছরই কিছু কাজ করছে। আসলে বইমেলাটা তো প্রায় বাণিজ্য মেলার মতো। এখানে মধ্যবিত্তরা শখ করে যায়, পড়ুক না পড়ুক; দুটো বই কেনে। তাই প্রকাশকরাও এই বই-বাণিজ্য মেলার অপেক্ষায় থাকেন।

কেউ বলেন, বইয়ের পাঠক কমেছে। আবার কেউ বলেন, বেড়েছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী বলে?

দেবব্রত মুখোপাধ্যায় : বইয়ের পাঠক কমেনি। প্রতি বছর মেলা থেকে আমরা রিপোর্ট পাই, বই বিক্রি বাড়ছে। তাহলে পাঠকও কিছু নিশ্চয়ই বাড়ছে। বলা যেতে পারে, বিক্রি বাড়লেও পাঠ বাড়েনি। কিন্তু আমি আমার চারপাশে দেখি লোকেদের পাঠের আগ্রহ বাড়ছে। আমাদের সময় এত মানুষ পড়ত না। হ্যাঁ, এখন হয়তো কাগজের বইয়ের চেয়ে নানা রকম ডিজিটাল মিডিয়ায় মানুষ বেশি পড়ছে। পড়ছে তো।

 বইমেলার আয়োজন ও পুরস্কার নিয়ে বাংলা একাডেমি সম্পর্কে একটা সমালোচনা রয়েছে। সার্বিকভাবে বাংলা একাডেমির ভূমিকাকে কেমন দেখছেন এবং কেমন হতে পারে?

দেবব্রত মুখোপাধ্যায় : বাংলা একাডেমিকে আমার দেশের আর দশটা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ভিন্ন মনে হয় না। তেমন কোনো সৃজনশীলতা নেই। তবে আমার মূল বক্তব্য হলো, বইমেলাটা বাংলা একাডেমির আয়োজনে থাকা উচিত না। দেখেন, বইমেলার শুরু একজন প্রকাশকের হাতে। এটা প্রকাশকদের হাতেই থাকা উচিত। আমার ধারণা, তাহলে এটার বাণিজ্য আরও বাড়বে। বইমেলাকে লেখকদের স্বপ্নপূরণের, সুজনশীল জায়গা ভাবতে গিয়েই মুশকিল হয়েছে। এটা নিজেকে বোঝাতে হবে যে এটা কেনাবেচার জায়গা; কবিতা পাঠের বা শাড়ি পরে ঘোরার জায়গা নয়। আর সেই কেনা কিসে বাড়বে, এটা প্রকাশকরাই সবচেয়ে ভালো বলতে পারেন। তাদের কাজটা তাদেরই করতে দিন। বাংলা একাডেমি অন্য কোনো নামে, অন্য কোনোভাবে বছরে একটা লেখক-পাঠক উৎসব করতেই পারে। তবে সেটা বইমেলা নয়।

বইমেলাকে কীভাবে লেখক-পাঠকঘনিষ্ঠ করে তোলা যায়?

দেবব্রত মুখোপাধ্যায় : আবারও বলি, বইমেলাকে লেখক-পাঠক সম্পর্ক তৈরির প্ল্যাটফর্ম ভাবাটাই মৌলিক ভুল। এর দরকার কী? হ্যাঁ, যদি কোনো লেখক মেলায় বসে অটোগ্রাফ দিলে বাণিজ্যিক লাভ হয়, সেটা করা যেতে পারে। এর বেশি দরকার নেই। লেখক-পাঠক এত ঘনিষ্ঠ হওয়ার দরকারটা কী? পুরনো কথাই বলি, বাংলা একাডেমি প্রয়োজনে পাঠক-লেখক উৎসব করতে পারে। কিন্তু বইমেলাকে ওর থেকে রেহাই দিলে বেচাকেনা বাড়বে বলে মনে হয়। সেটাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।