ভারতে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী (সিএএ) পাস হওয়ার পর থেকে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তাতে মোটাদাগে রয়েছে তফসিলি জাতিভুক্ত (শিডিউলড ট্রাইব-এসটি) মতুয়া সম্প্রদায়। আইনটি পাসের পর থেকে বাংলাদেশ থেকে দেশান্তরী হওয়া এই জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব বিতর্ক আরও একবার জোরালো হলো; ঠিক যখন ভারতের কেন্দ্রীয় লোকসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আর কয়েক সপ্তাহ বাকি। বাংলাদেশের যশোর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা থেকে ভারতে চলে যাওয়া এসব মানুষ দশকের পর দশক থেকে রাজনীতির জটে ঘুরপাক খাচ্ছেন।
দেশভাগের পর নানা সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যাওয়া মতুয়ারা হিন্দুধর্মের বর্ণভিত্তিক প্রথারও বাইরে অবস্থান করেন। নিজেদের ‘উদ্বাস্তু’ বলে পরিচয় দেওয়া এসব মানুষকে নিয়ে উনিশ শতকে সমাজ সংস্কারমূলক আন্দোলনের নেতা ছিলেন বাংলাদেশের ফরিদপুরের মতুয়া সম্প্রদায়ের নেতা হরিচাঁদ ঠাকুর। পরবর্তী সময়ে হরিচাঁদের ছেলে গুরুচাঁদ ঠাকুর এই সম্প্রদায়ের নেতা হন। তিনি সারা ভারত মহুয়া মহাসংঘের নেতা।
বর্তমান রাজবংশী সম্প্রদায় পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম এসটি সম্প্রদায় যাদের বড় অংশও বাংলাদেশ থেকে গিয়েছেন। তাদের পরই পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় বৃহত্তম এসটি সম্প্রদায় মতুয়ারা। তারা রাজ্যটির মোট জনসংখ্যার ৩.৮ শতাংশ। রানাঘাট ও বনগাঁ বিধানসভা কেন্দ্রে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এ ছাড়া উত্তর ২৪ পরগনা ও নদীয়া জেলায় তারা নির্ণায়ক ভূমিকায় থাকেন। তারাই নির্ধারণ করেন নির্বাচনী জয়-পরাজয়। গত লোকসভা নির্বাচনে মতুয়া ঠাকুরবাড়ির সন্তান গুরুচাঁদ ঠাকুরের নাতি শান্তনু ঠাকুর বিজেপিতে যোগ দিয়ে এমপি হন এবং পরে কেন্দ্রীয় জাহাজ শিল্প প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। সম্প্রতি তিনি একটি জনসভায় ঘোষণা দেন, সিএএ শিগগিরই চালু হবে এবং এর মধ্য দিয়ে মতুয়ারা নাগরিকত্ব পাবেন। সিএএ আইনে বলা হয়, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও খ্রিস্টানরা যদি ধর্মীয় সহিংসতার কারণে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ভারতে এলে, তারা ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবেন। সমালোকরা বলছেন, এই আইনে নির্যাতিত মুসলিমদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিধান না থাকা বিজেপির সাম্প্রদায়িক নীতির প্রতিফলন।
শান্তনুর বক্তব্যের কয়েক সপ্তাহ আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও কলকাতায় এসে বলে যান আইনটি কার্যকরের কথা। ভারতের গণমাধ্যমগুলোতে বলা হয়েছিল, নাগরিকত্ব আইনের নিয়মকানুন তৈরির কাজ শেষ।
কিন্তু ২০১৯ সালের সিএএ পাসের পর থেকে নিজ রাজ্যে এটা চালুর বিপক্ষে কথা বলছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কংগ্রেস থেকে শুরু করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি-মার্কসবাদীও (সিপিআইএম) এর বিরোধিতায় সরব। সিএএ নিয়ে হইচইকে তারা বিজেপির রাজনৈতিক অভিসন্ধি বলছেন।
তৃণমূল নেত্রী মমতার যুক্তি, ভারতের নির্বাচনগুলোতে ভোট দেন মতুয়ারা, কাজেই তারা এরই মধ্যে দেশের নাগরিক। বিজেপি মতুয়াদের নাগরিক বানানোর কথা বলে রাজনৈতিক ফায়দা তুলছে। অনেক উদ্বাস্তু সংগঠনও এই আইনের বিরোধী। রাজবংশীরাও এ নিয়ে ততটা আগ্রহী নয়। গত সোমবার পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটি সংগঠন সিএএ কার্যকরে বিজেপির সক্রিয়তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে।
কলকাতা প্রেস ক্লাবে গত সোমবার সম্মিলিত কেন্দ্রীয় বাস্তুহারা পরিষদ (ইউসিআরসি), সংবিধান বাঁচাও মঞ্চ, পশ্চিমবঙ্গ ন্যায়মঞ্চ-সহ আরও কয়েকটি উদ্বাস্তু ও সামাজিক গণসংগঠন যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে।
প্রধানমন্ত্রী নরন্দ্রে মোদি ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই ইস্যুতে একযোগে আক্রমণ করে পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য বলেন, ‘ভোট এলেই দিল্লি ও কলকাতায় নাগরিকত্বের বিষয় নিয়ে খুব হইচই হয়। শুধু ভোটের জন্য একজন বলছেন নাগরিকত্ব দেবই। আর এক জন বলছেন, এখানে কোনো প্রয়োজন নেই। দুজনেই রাজনীতি করছেন।’ সিপিআইএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, ‘আমরা নাগরিকত্ব দিচ্ছি, ২০১৯ সালে এটা বলে মানুষকে ঠকানোর একটা ব্যবস্থা করেছে বিজেপি সরকার।’