জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) গত ৯ বছরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বহিরাগত নারীকে শারীরিক হেনস্তা, নিপীড়ন ও ধর্ষণের অন্তত ১০টি ঘটনা ঘটেছে। যার সব কটি ঘটনায় জাবি শাখা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। সর্বশেষ গত শনিবার স্বামীকে হলে আটকে রেখে গৃহবধূকে দল বেঁধে ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদ ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বর্তমানে উত্তাল জাবি ক্যাম্পাস। যদিও নারী নিপীড়নের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও মেলে না প্রতিকার, অধিকাংশই সময়েই পার পেয়ে যায় অভিযুক্তরা।
শুধু নারী নিপীড়নই নয়, আরও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে অছাত্ররা অবৈধভাবে অবস্থান করে নির্ভয়ে বিভিন্ন অপরাধ করে। আর তাদের বেশিরভাগই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ছাত্রত্ব শেষ হলেও প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না। আবার অনেক সময় প্রশাসন অপরাধীদের নামমাত্র শাস্তি দিয়ে দায় এড়িয়ে যায়। ফলে অপরাধীরা অপরাধ করতে আরও উৎসাহ পায়। অনেক সময় অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৫ সালের এপ্রিলের শুরুতে জাবি ক্যাম্পাসে ঘুরতে এসে ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হন এক দম্পতি। একই বছর ১ বৈশাখে যৌন হেনস্তা, ছিনতাই ও মারধরের শিকার হন এক আদিবাসী ছাত্রী। ওই ঘটনায়ও জড়িতরা ছিলেন জাবি ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। একই বছর ৬ মার্চ দোল উৎসবে নিপীড়নের শিকার হন এক ছাত্রী। ওই ঘটনায় ছাত্রলীগের এক নেতাকে তিন মাসের জন্য ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। এরপর ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে বহিরাগত এক নারীকে উত্ত্যক্ত করতে বাধা দেওয়ায় লাঞ্ছনার শিকার হন শিক্ষক। ওই ঘটনায় তিন ছাত্রলীগ কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এরপর ২০১৮ সালের জুনে ঘুরতে আসা এক ব্যক্তি ও তার বান্ধবীর মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তিনজনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ছিনতাই করার সময় বাধা দেওয়ায় এক ছাত্রীকে লাঞ্ছিত ও এক সংবাদকর্মীকে মারধরের অভিযোগে ছাত্রলীগের পাঁচজনকে সাময়িক বহিষ্কার করে প্রশাসন। একই বছরের নভেম্বরে এক শিক্ষার্থী ও তার বান্ধবীর কাছে চাঁদা দাবি করে না পাওয়ায় মারধর এবং ধর্ষণের হুমকি দিয়ে কানের দুল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাতেও জড়িতরা ছিলেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। এরপর ২০১৯ সালের ৫ নভেম্বর উপাচার্য ফারজানা ইসলামের অপসারণ দাবির আন্দোলনে ছাত্রলীগের হামলায় নারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ অন্তত ৩৫ জন আহত হন। কোনো বিচার হয়নি ওই ঘটনার। ২০২২ সালের জুনে পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে মারধর ও আরেক নারী শিক্ষার্থীকে শারীরিক হেনস্তার অভিযোগ ওঠে দুই ছাত্রলীগ কর্মীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনার বিচার চেয়ে প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।
ছিনতাই ও চাঁদাবাজি : গত দুই বছরে অন্তত ১২ বার বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বাস, লেগুনাসহ বিভিন্ন যানবাহন আটকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ওঠে জাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান লিটনসহ ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত চারবার ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে ক্যাম্পাসে তুলে এনে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। বাকি না দেওয়ায় খাবার
দোকানিকে মারধরের অভিযোগও রয়েছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
গত শনিবারের ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট সভায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা শেষমেশ কার্যকর করা হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে শিক্ষার্থীদের। এই প্রসঙ্গে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আলিফ মাহমুদ বলেন, ‘প্রশাসন প্রতিবারই অভিযুক্তদের নামমাত্র শাস্তি ঘোষণা করে। কিন্তু পরে সেই শাস্তি কার্যকরে গড়িমসি করে। যেটা আমরা প্রত্যেকবারই প্রত্যক্ষ করেছি।’
ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচার কার্যকর করা, অছাত্রদের হল থেকে বের করা এবং নিপীড়নমুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ‘নিপীড়নবিরোধী মঞ্চ’ তৈরি করেছে। যার আহ্বায়ক করা হয়েছে দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইনকে। তিনি দেশ রূপান্তরকে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে যত অপরাধ সংঘটিত হয়, তার অধিকাংশতেই দেখা যায় ছাত্রলীগের অছাত্ররাই জড়িত। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে প্রশাসন সেই অপরাধীকে নামমাত্র শাস্তি দেয়, যা অপরাধীকে পরে আরও অপরাধ করতে উৎসাহ জোগায়।’
তবে অপরাধ করলে অপরাধীকে যথোপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয় বলে দাবি করেন প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেউ কোনো ধরনের অপরাধ করলে আমরা উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করি। তবে কোনো কোনো ঘটনায় দেখা যায়, আমরা অভিযোগ পাই না। অভিযোগ না পেল আমরা বিচারও করতে পারি না।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলম বলেন, ‘এবারের ঘটনায় আমরা অভিযুক্তদের যে শাস্তির ব্যবস্থা করেছি, এর আগে কখনো কেউ করেছিল বলে আমার মনে হয় না। অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আমরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই শাস্তি কার্যকর করার ব্যবস্থা করব।’