গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় ছয় মাসের ব্যবধানে সমর কান্তি রায় ও তৃপ্তি রানী ম-ল নামে আরেক শিক্ষক দম্পতি নিখোঁজ হয়েছেন। কয়েক দিন ধরে এই শিক্ষক দম্পতির কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের নিখোঁজে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
সমর কান্তি রায় কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ি ইউপির রুথিয়ারপাড় গ্রামের অশ্বিনী কুমার রায়ের ছেলে এবং মুকসুদপুর উপজেলার কহলদিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক। অপরদিকে সমর কান্তি রায়ের স্ত্রী তৃপ্তি রানী ম-ল কোটালীপাড়া উপজেলার ১৮২ নম্বর রুথিয়ারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। এই শিক্ষক দম্পতি কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ি ইউপির কালিগঞ্জ বাজারে নিজেদের বাড়িতে বসবাস করতেন। বিভিন্ন মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সুদের টাকার চাপ সামলাতে না পেরে এই শিক্ষক দম্পতি নিখোঁজ হতে পারেন বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
এর আগে গত বছরের জুন মাসে কোটালীপাড়া উপজেলার কান্দি ইউপির ১২৭ নম্বর গজালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খোকন চন্দ্র রায় ও তার স্ত্রী একই বিদ্যালয়ের সরকারি শিক্ষক শিখা রানী রায় নিখোঁজ হন। ছয় মাস অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত এই শিক্ষক দম্পতির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এই দম্পতিও মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছিলেন বলে তাদের সহকর্মীদের কাজ থেকে জানা গেছে।
গতকাল মঙ্গলবার উপজেলার কালিগঞ্জ বাজারে শিক্ষক সমর কান্দি রায়ের বাড়িতে গিয়ে তার বসতঘরটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে। অপরদিকে তার বাড়ির পাকা ভবনটিতে ভাড়াটিয়া ৩টি পরিবারকে পাওয়া যায়। ভাড়াটিয়া অলক মল্লিক বলেন, ‘কালিগঞ্জ বাজারে কাপড়ের ব্যবসা করার কারণে পাশে শিক্ষক সমর কান্তি রায়ের বাড়িতে পরিবার নিয়ে ভাড়ায় থাকি। তিনি আমার কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা নিয়েছেন। বিনিময়ে আমার পরিবার নিয়ে এখানে থাকতে দিয়েছেন। শুনেছি সমর কান্তি রায় পিঞ্জুরী গ্রামের বাদল সমাদ্দারসহ অনেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সুদে টাকা এনেছিলেন। এই সুদি মহাজনদের চাপে শিক্ষক সমর কান্তি রায় ও তার পরিবার নিখোঁজ থাকতে পারেন।’
অপর ভাড়াটিয়া স্বপন কুমার বাড়ৈর স্ত্রী প্রভা রায় বলেন, ‘আমার স্বামী একজন স্কুলশিক্ষক। স্কুলটি কাছাকাছি হওয়ার কারণে পরিবার নিয়ে এখানে ভাড়া থাকি। বাড়ি ভাড়ার অগ্রিম হিসেবে সমর কান্তি রায় আমার স্বামীর কাছ থেকে লিখিত দিয়ে দেড় লাখ টাকা নিয়েছেন। কয়েক দিন ধরে তার সন্ধান পাচ্ছি না। এখন বাদল সমাদ্দার নামে এক ব্যক্তি এসে এই বাড়িটি তার বলে দাবি করছেন। তিনি আমাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছেন।’
কালিগঞ্জ বাজারের ওষুধ ব্যবসায়ী বিধান চন্দ্র বালা বলেন, শিক্ষক সমর কান্তি রায় আমার কাছ থেকে সুদে ২ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। হঠাৎ কয়েক দিন ধরে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানতে পারলাম। শুনেছি তিনি নাকি অনেক লোকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন।’
তবে বাদল সমাদ্দার বলেন, ‘সমর কান্তি রায়ের সঙ্গে আমার কোনো সুদের ব্যবসা ছিল না। তবে তার সঙ্গে আমার চেনাজানা ছিল। তিনি কয়েক দিন আগে তার ১৩ শতাংশ জায়গাসহ একটি টিনের ঘর ও একটি পাকা ভবন ৯ লাখ টাকায় আমার কাছে বিক্রি করেছেন। সমর কান্তি রায় এখন কোথায় আছে, আমার জানা নেই।’
১৮২ নম্বর রুথিয়ারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশুতোষ রায় বলেন, তৃপ্তি রানী রায় আমার বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। গত ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি দুই দিনের ছুটি নিয়ে ছিলেন। এরপর থেকে তিনি আর স্কুলে আসেননি।’
মুকসুদপুর উপজেলার কহলদিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের শরীরচর্চা শিক্ষক শাহ মো. ইলিয়াছ বলেন, ‘সমর কান্তি রায় আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ছুটি না নিয়ে কয়েক দিন ধরে তিনি বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। সমর কান্তি রায়ের মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়ার পর তার বাড়িতে লোক পাঠাই। এরপর আমরা জানতে পারি, তিনি পরিবারসহ নিখোঁজ রয়েছেন।’
কোটালীপাড়া উপজেলার ৭৯ নম্বর পূর্ণবর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন বলেন, ‘বর্তমানে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেক শিক্ষককে মহাজনদের কাছ থেকে সুদে টাকা নিতে হয়। এরপর অনেক শিক্ষক এই টাকা পরিশোধ করতে না পেরে নিখোঁজ থাকেন বা আত্মগোপনে চলে যান। সরকার যদি বেতন বৃদ্ধিসহ সহজ শর্তে শিক্ষকদের সুদমুক্ত ঋণ দেয়, তাহলে কোনো শিক্ষককে সুদি মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বিপদে পড়তে হয় না। তাই আমি শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধিসহ সহজ শর্তে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, ‘১৮২ নম্বর রুথিয়ারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তৃপ্তি রানী ম-ল কয়েক দিন ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে জানতে পেরেছি। বিষয়টি লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি।’
কোটালীপাড়া থানার ওসি মুহাম্মদ ফিরোজ আলম বলেন, শিক্ষক দম্পতি নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।