প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ছিলেন বাংলাদেশ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আর্ট গ্যালারি ‘শিল্পাঙ্গন’। প্রগতিশীল পাঠাগার ‘সমাজতান্ত্রিক পাঠাগার’-এর প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রথম প্রধান সম্পাদক অকৃতদার এই কবি ও ছড়াকার মারা যান ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে চিন্তা পাতায় ছাপা হলো তার লেখা উপসম্পাদকীয়
ইসলামপুরে তখন প্রায় দৌড়ে চলেছি। সন্ধ্যা ছ’টা থেকে কারফিউ। হঠাৎ দেখি তখন তাসিকুলও (আলম) আমার মতো দ্রুত ছুটে চলেছে।
ডাকলাম। দেখি তার হাতের নিচে একতাড়া কাগজ। ও বলল : তোর কাছে এগুলো কী? ‘একুশের বিশেষ সংখ্যা।’ তাকে ক’টা বের করে দিলাম। সে আমাকে অবাক করে একগুচ্ছ কাগজ হাতে তুলে দিয়ে বলল : এটাও বিশেষ সংখ্যা, একুশের ওপর। এর অর্থ সন্ধ্যায় ঢাকায় একুশের গুলিসহ দু’দিনের নিজের চোখে দেখা তাৎক্ষণিক রিপোর্ট নিয়ে দুটো ‘বিশেষ সংখ্যা’ পত্রিকা বের হয়েছিল। সে বলল : কোথা থেকে বের করলি এ পত্রিকা?
: দিলরুবা পত্রিকার প্রেস থেকে। আমি আর আবদুল্লাহ আল-মুতী, দু’দিনের সমস্ত ঘটনাই এতে লিখেছি।
আমাদের দেশে যত সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছে, তার মধ্যে বাইশে ফেব্রুয়ারির মতো সর্বগণউত্থান ও বিদ্রোহ খুব কমই দেখেছি। একুশে ফেব্রুয়ারি আকস্মিক গুলিবর্ষণে ভাষার জন্য আন্দোলনরত ছাত্রদের হত্যা করা হয়েছিল। তাদের সবার লাশ পাওয়া যায়নি। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় অংশের আন্দোলন ও পুলিশের টিয়ারগ্যাস বর্ষণ এবং গ্রেফতার বন্ধ ছিল। বিকেলে দ্বিতীয় পর্যায়ে আন্দোলনে বিরতি ছিল। কেবল একটা ছাত্রদল ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটির পাশের রাস্তার ভেতরে শ’খানের ছাত্র পরিষদ সদস্যের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য স্লোগান দিচ্ছিল। তারই এক পর্যায়ে তিনটা দশ বা পনেরো মিনিটের সময় আর্মড পুলিশ এসপি মাসুদের নির্দেশে বহুলাংশে প্রশমিত ছাত্রদের ওপর গুলি চালায়। আগুনের ফুলকির মতো সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে গুলির খবর। শোকাভিভূত মানুষের ভিড় হতে থাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে। তখন ছাত্ররা দাবি করছিল যে, চৌদ্দজন এই গুলিতে নিহত হয়েছে। গুলির পর গোলযোগের সময় তিনজনের লাশ প্রথমে পাওয়া যায়। পুলিশ গভীর রাতে আজিমপুর গোরস্তানে কিছু লাশের কবর দেয়। এই কবর পরে ছাত্ররাই সন্ধান করে বের করতে সক্ষম হয়েছিল। তখন জানা যায়, এই গোরস্তানে মাত্র দু’জন নিহত ছাত্রের লাশ রয়েছে। আর সমস্ত লাশ কোথায় গেল তা কেউ জানে না।
বাইশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত দিবস। এ দিনটি সমগ্র শহরের মানুষকে সম্পূর্ণভাবে এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত করে ফেলে। উত্তাল এই দিন যদি অগ্নিময় হয়ে না উঠতো, তবে একুশের গৌরব ও মর্যাদা এতোটা বৃদ্ধি পেত না। আমাদের বিক্ষোভ মিছিলের একটা খন্ডিত অংশ যখন সদরঘাটের কাছে পৌঁছেছিল, তখনই আমার মাথায় বিশেষ সংখ্যা বের করার চিন্তা কাজ করে। সে সময় আরো কয়েকটি খন্ডিত মিছিল শহরের বিভিন্ন রাস্তায় ছিল। মাসিক দিলরুবার মালিক এডিটর কাদের সাব, তার কাছে গিয়ে উপস্থিত। গিয়ে দেখি তিনিও একটা মানসিক অস্থিরতা নিয়ে ঘরে বসে আছেন। শহরে কী হচ্ছে জানার জন্য উৎকণ্ঠ। আমি গিয়ে বললাম, শহর আজ বিদ্রোহের আগুনে জ্বলছে। দু’দিনের ঘটনার একটা বিশেষ সংখ্যা বের করতে হয়। কোনো দৈনিকই আমাদের নয়। এ আগুন ছড়িয়ে দিতে হবে।
আমার সঙ্গে পরিচয় প্রায় দু’বছর পূর্বে ‘দিলরুবা’ বের করার আয়োজনের সময় থেকে। কখন কীভাবে মনে নেই। কাদের সাবের স্ত্রীর নাম দিলরুবা। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি বিসিএস থেকে পদত্যাগ করেন এবং স্ত্রীর নামে এই পত্রিকা ঢাকা থেকে প্রকাশ করেন। আমার কথা শুনে তিনি চেয়ার থেকে উঠে বললেন : চলুন, এক্ষুণি একটা বিশেষ সংখ্যা বের করব। আপনি লিখে শেষ করতে পারবেন? ‘এই লিখতে বসলাম। আপনি প্রেসকে সতর্ক করুন।’ বাইরে থেকে প্রেসে তালা দেয়া। এক সময় কড়া নড়ল। ভেতরে প্রবেশ করলেন আমাদের আবদুল্লা আল-মুতী, সাহিত্যিক বন্ধু ও সহযোদ্ধা। পরিশ্রান্ত চেহারা। বললাম এই যে মুতী সাব, বসে যান।
‘কী হচ্ছে?’
‘বিশেষ সংখ্যা হত্যা-গুলির ওপর।’
‘আমি তো সেটার কথাই ভাবছি।’
মুতীর আর কথা নয়। তিনি লিখতে শুরু করলেন। লিখছেন, তার অভিজ্ঞতা।
পাঁচটার কিছু পরেই ছাপা শুরু হয়ে গেল। প্রুফ দেখা হয়েছিল মাত্র একবার, ভুল অনেক। গুলি আর হত্যার কথা দিয়ে হেডিং। সাড়ে পাঁচটায় প্রথম কপি হাতে এলো। আমি, মুতী আর কাদের সাব এক বিজয়ের আনন্দে যেন মেতে উঠলাম। আমরা যেন মৃতের প্রতি আমাদের প্রথম দায়িত্ব পালন করেছি। ডিমাই সাইজে ভাঁজ করা চার পাতার প্রথম পৃষ্ঠায় ছিল আমিনুলের স্কেচ। আমাদের লেখা যখন প্রায় শেষ সে সময় হঠাৎ শিল্পী আমিনুল ইসলাম উ™£ান্ত অবস্থায় এসে উপস্থিত। আমি বললাম : এই আমিনুল, বাঁচিয়েছিস। এই গুলির ওপর একটা স্কেচ বা কার্টুন এক্ষুণি করতে হবে। কোনো কথা বলেনি আমিনুল। একটা সাদা কাগজ তুলে নিয়ে বসে গেল সে। তখন বাজারে বল কলম ছিল না। রেগুলার পেন। সে পেন দিয়ে সে একটা স্কেচ আঁকল, পুলিশ গুলি করছে ছাত্রদের ওপর। মাথায় তখন যা এসেছিল তাই সে এঁকেছে। ছুটল পিয়ন মদনমোহন বসাক রোডে ছবিটার ব্লক করতে। দাঁড়িয়ে থেকে ব্লক করিয়ে পিয়ন সাইকেলে ফিরে এলো। সেটাই ছিল আমাদের প্রথম পাতায় দু’কলামে। পাতাটা মূল্যবান হয়ে উঠল। আমিনুলের সেই স্কেচই একুশের ওপর সর্বপ্রথম অঙ্কিত চিত্র। সন্ধ্যা ছ’টা থেকে ঢাকা শহরে কারফিউ শুরু হবে। বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে রাস্তার মোড়ে মোড়ে কারফিউর আগে আর্মি নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাদের হাতে রাইফেল।
এই একুশ-বাইশের হত্যাকান্ড ও আন্দোলনে কোনো রাজনৈতিক পার্টির সহযোগিতা ছিল না। প্রকৃতপক্ষে ভাষার আন্দোলন ছিল ছাত্রদের এবং পরে ঢাকার সাধারণ মানুষ এতে যোগদান করে। মওলানা ভাসানী ভাষাসংক্রান্ত কমিটির প্রধান হলেও এবং তিনি একুশে ধর্মঘট আহ্বান করলেও তিনি ঢাকায় ছিলেন না।
ভাষার এক অদ্ভুত প্রভাব আছে মানুষের ওপর। একবেলা, একদিন বা দু’দিন প্রয়োজনে না খেয়ে মানুষ বাঁচতে পারে। দামি পোশাক বা সাধারণ পোশাক না পরেও মানুষ চলতে পারে। অপছন্দের সংস্কৃতি বা কাজকে মানুষ পরিহার করেও সমাজে গৃহীত হতে পারে। কিন্তু মানুষ কোনো ভাষা ব্যবহার না করে কোনো দিকেই অগ্রসর হতে পারে না। মায়ের ভাষা, মুখের ভাষা ব্যবহার না করে সে জীবনযাপন করতে সক্ষম নয়। ভাষা খাদ্য, বস্ত্র ও কর্মের চাইতে মূল্যবান। সর্বাগ্রে কথা বা ভাষা, তার পরে জীবনের যাত্রা। সে কারণে জাতীয় বা আঞ্চলিক কোনো ভাষার ওপর হাত পড়লে সকল মানুষই রুখে দাঁড়ায়। সে ক্ষেত্রে শিক্ষিত বা অশিক্ষিতের মধ্যে কোনো তফাত নেই সব মানুষের মিল এখানেই, ভাষাতেই। বিশ্বময়। ভাষার ব্যাপারটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
বাইশে ফেব্রুয়ারি গণঅভ্যুত্থানের পর তাদের চেতনার উন্মেষ ঘটতে শুরু করে। সেদিন কেবল ঢাকাতেই গণঅভ্যুত্থান হয়নি, সমগ্র প্রদেশের সর্বত্র ছাত্রহত্যার প্রতিবাদ ওঠে; কিন্তু কোনো রাজনৈতিক উত্থান ঘটেনি। দেশ বিভাগের পর মাত্র পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হয়েছিল। ১৯৪৭ সাল থেকে এ অঞ্চলে তিনটি রাজনৈতিক দল দেশে ছিল মুসলিম লীগ, কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি। পরে ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামক একটি লীগবিরোধী গণতান্ত্রিক পার্টি গঠিত হয়।
আমাদের পরম শান্তি ছিল যে, আমরা এ দুটো বিশেষ সংখ্যা বের করেছিলাম। কিন্তু এই দিনটা ছিল প্রচন্ড বিস্ফোরণোন্মুখ। দিনে মর্নিং নিউজ পুড়িয়ে দিয়েও জনতা শান্ত ছিল না। তারা ‘আজাদ’ ও ‘সংবাদ’ আক্রমণ করার জন্য সংঘবদ্ধ হয়। আর্মি ও পুলিশ নবাবপুরে গুলি চালিয়ে কর্ডন করে আক্রমণকারী জনতার হাত থেকে ‘সংবাদ’ রক্ষা করে। বিক্ষুব্ধ মিছিলের একটা অংশ ঢাকেশ্বরীতে ‘আজাদ’ পত্রিকার ওপর চড়াও হয়। ওখানে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে জনতাকে দূরে রাখতে সমর্থ হয়। ঢাকাতে অন্তত পাঁচ স্থানে গুলিবর্ষণ হয়।
তখন ঢাকায় অবজারভার বন্ধ এবং ‘আজাদ’, ‘সংবাদ’ ইত্যাদি কাগজ ছিল মুসলিম লীগের। ফলে জনগণ প্রকৃত ঘটনা ও সংবাদ সে সময়ে পায়নি বললেই চলে। এ ক্ষেত্রে মফস্বলের জেলাকেন্দ্রিক কয়েকটি সাপ্তাহিক অসাধারণ দৃঢ় মনোবলের পরিচয় দেয়। তারা যতদূর সম্ভব সংবাদ ও বাংলার পক্ষে যুক্তিসহ বক্তব্য প্রকাশ করে গেছে। সিলেটের মাহমুদ আলী ও স্ত্রী হাজেরা মাহমুদ ‘নওবেলাল’ সাপ্তাহিকে অসাধারণ প্রচার চালিয়েছিলেন। নোয়াখালীর খাজা আহমদ তার সাপ্তাহিককেও প্রচন্ড বিপ্লবী ভূমিকায় নিয়েছিল। প্রদেশে আরও কয়েকটি সাপ্তাহিক তখন ছিল জনগণের জন্য প্রকৃত সংবাদবাহক। নানা দিকে গোলাগুলি, লাঠিচার্জ এবং অপরদিকে স্লোগান এরই মধ্যে দু’বন্ধু তাসিকুল ও আমি বিশেষ সংখ্যা হাতে কারফিউ ছ’টায় শুরু হওয়ার সময় আস্তানায় ফিরি আমি ৪নং আবুল হাসনাত রোডে এবং সে ইকবাল হলে। (সংক্ষেপিত)
লেখক: বরেণ্য সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব