ইজতেমা ময়দানে জুমার জামাতে মুসল্লিদের ঢল

টঙ্গীর তুরাগ তীরে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের প্রথম দিন গতকাল শুক্রবার জুমার জামাতে যোগ দিতে মুসল্লিদের ঢল নামে। ইজতেমায় আসা মুসল্লি ছাড়াও গাজীপুর, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখ লাখ মুসল্লি যোগ দেন জামাতে।

মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর অনুসারীদের বিশ্ব ইজতেমার এই পর্ব বাদ ফজর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। রবিবার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে দুই পর্বের বিশ্ব ইজতেমা শেষ হবে।

ভোর থেকেই মুসল্লিদের ইজতেমা মাঠের দিকে ঢল নামে। অনেকে মহাসড়ক ও অলিগলিসহ যে যেখানে পেরেছেন হোগলা পাটি, চটের বস্তা, খবরের কাগজ বিছিয়ে জুমার নামাজে শরিক হন।

বৃহস্পতিবার বাদ আসর থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে মাওলানা আবদুস সাত্তারের জিম্মাদারিতে আমবয়ানের মধ্য দিয়ে ইজতেমার অনানুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। দ্বিতীয় পর্বেও দেশের ৬৪ জেলা ছাড়াও বিদেশি মুসল্লিরা ইজতেমায় অংশ নিয়ে ৮৫টি খিত্তায় অবস্থান নিয়েছেন।

গত ২ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে প্রথম পর্বের বিশ্ব ইজতেমার সমাপ্তি ঘটে। প্রথম পর্বে ইজতেমায় অংশ নেন জোবায়েরপন্থি হিসেবে পরিচিত তাবলিগ জামাতের মুসল্লিরা। মাঝে চার দিন বিরতি দিয়ে দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের অনুসারী (মাওলানা সা’দপন্থি) মুসল্লিরা বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বে অংশ নিচ্ছেন।

প্রথম পর্বের মতো দ্বিতীয় পর্বেও ইজতেমার সার্বিক নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গড়ে তুলেছেন নিরাপত্তা বলয়। ৫৭তম বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরুর পর সকাল থেকে গাজীপুর সিটি মেয়রের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম দেশি-বিদেশি বিভিন্ন খিত্তায় গিয়ে ইজতেমায় আসা মুসল্লিদের খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং সব ধরনের সেবা প্রদান করেন। এ ছাড়া সাবেক যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. জাহিদ আহসান রাসেল এমপি বিদেশিদের খিত্তায় খিত্তায় গিয়ে মুসল্লিদের খোঁজখবর নেন। ইজতেমা ময়দানে অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছর ইজতেমায় পানির ব্যবস্থা, টয়লেটখানা, গ্যাস ব্যবস্থা, ফায়ার সার্ভিস, পয়ঃনিষ্কাশন কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে।

জুমার নামাজে মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা : ইজতেমা ময়দানে জুমার নামাজ আদায় করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খান, সাবেক মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম, মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল আহসান সরকার রাসেল।

৬ মুসল্লির মৃত্যু : বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের প্রথম দুদিনে ছয়জন মুসল্লি মৃত্যুবরণ করেছেন। তাদের মধ্যে চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের মিডিয়া সমন্বয়কারী মোহাম্মদ সায়েম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মৃতদের মধ্যে পাঁচজনই বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

এই পাঁচজনের মধ্যে যে তিনজনের পরিচয় জানা গেছে তারা হলেন শেরপুর সদর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের মোহাম্মদ আবুল কালাম (৬৫), নেত্রকোনার কেন্দুয়া থানার কুতুবপুর গ্রামের মো. হেলিম মিয়া (৬৫) ও দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার শিবনগর এলাকার মো. জহির উদ্দিন (৭০)।

এ ছাড়া ভোরে হেঁটে ইজতেমা ময়দানে যাওয়ার পথে উত্তরার আবদুল্লাহপুর মাছ বাজারের এলাকায় বাসের ধাক্কায় আবুল কাশেম (৬৫) নামে এক মুসল্লি মারা গেছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন তিনজন। নিহত কাশেম লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার বাসিন্দা।

যারা বয়ান করছেন : ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের মিডিয়া সমন্বয়কারী মোহাম্মদ সায়েম জানান, শুক্রবার ফজরের পর বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ইলিয়াস বিন সাদ, বাংলা তরজমা করেন মাওলানা মনির বিন ইউসুফ। সকাল ১০টায় তালিমের মৌজু করেন ভারতের মাওলানা ইলিয়াস। জুমার আগে জুমার ফাজায়েল বয়ান ১০ মিনিট কথা বলেন মাওলানা মনির বিন ইউসুফ। জুমার পর আরবিতে বয়ান করেন শেখ মোফলে। বয়ান বাংলা তরজমা করবেন মাওলানা শেখ আবদুল্লাহ মনসুর। আসরের পর বয়ান করেন বাংলাদেশের মাওলানা মোশাররফ, বাদ মাগরির বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ইউসুফ বিন সাদ। আর বাংলা তরজমা করেন মাওলানা জিয়া বিন কাশেম।

আজ ফজরের নামাজের পর বয়ান করবেন ভারতের মাওলানা সাঈদ বিন সাদ। বাংলায় তরজমা করবেন মুফতি ওসামা ইসলাম, সকাল সাড়ে ১০টায় হালিমে হালকা মোয়াল্লেমদের সঙ্গে কথা বলবেন ভারতের মাওলানা আবদুল আজিম। আসরের পর বয়ান করবেন পাকিস্তানের মাওলানা ওসমান। বয়ানের বাংলা তরজমা করবেন মাওলানা আজিম উদ্দিন। বাদ মাগরিব বয়ান করবেন ভারতের মাওলানা মুফতি ইয়াকুব। বাংলায় তরজমা করবেন মাওলানা মনির বিন ইউসুফ।

এ ছাড়া রবিবার বাদ ফজর বয়ান করবেন ভারতের মাওলানা মুফতি মাকসুদ। বাংলায় তরজমা করবেন মাওলানা আবদুল্লাহ। বয়ানের পরপরই হেদায়েতি বয়ান এবং দোয়া পরিচালনা করবেন ভারতের মাওলানা ইউসুফ বিন সা’দ কান্ধলভী। তার বয়ান বাংলায় তরজমা করবেন মাওলানা মনির বিন ইউসুফ।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা : গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মাহবুব আলম বলেছেন, বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের মতো দ্বিতীয় পর্বেও ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই পুরো বিশ্ব ইজতেমাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব ইজতেমা কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথম পর্বে যেসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল এবারও ঠিক আগের মতোই নিরাপত্তা ব্যবস্থা অটুট থাকবে। বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে ময়দানের আশপাশে প্রায় সাত হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি আরও বলেন, বিশ্ব ইজতেমায় আসা বিদেশি মুসল্লিদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমার আয়োজকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

এ ছাড়া গাজীপুর সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন দ্বিতীয় পর্বেও তাদের সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।