সব বাধা পেরিয়ে তারা দৃষ্টিজয়ী আলোর পথযাত্রী। ব্রেইলপদ্ধতিতে পাতাজুড়ে ছয়টি করে বিন্দুর বিভিন্ন সংকেত। ঘর আকৃতির সংকেতগুলোতে হাত দিয়ে স্পর্শ করেই দৃষ্টিছাড়া অনর্গল পড়ে যাচ্ছেন বইয়ের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। আর তা মুগ্ধচিত্তে দেখছেন মেলায় আসা দর্শনার্থীরা। এই যেন দৃষ্টিছাড়া দৃষ্টিজয়ীদের জয়।
স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনী ২০০৯ সাল থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ শুরু করে। প্রথমে ছড়া, তারপর গল্পের বই ব্রেইলপদ্ধতিতে প্রকাশ করে তারা। এটিকে আরও ব্যাপক আকারে আনতে ২০১১ সাল থেকে বইমেলায় স্টল নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এখন পর্যন্ত ১৩১টি বই ব্রেইলপদ্ধতিতে প্রকাশ করা হয়েছে।
বইমেলার বাংলা একাডেমির গেটের পাশেই স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনীর স্টল ঘুরে দেখা যায়, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দুই শিক্ষার্থী উচ্চারণ করে ব্রেইল বই পড়ছেন। দর্শকরা তাদের পড়া শুনছেন। অনেকে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করছেন। তারা উত্তর দিচ্ছেন। কবি শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতাটি পড়ছিলেন বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী মোহিনী আক্তার। অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি বইমেলায় প্রতি বছরই আসি, আমার ভালো লাগে। স্পর্শ আমাদের জন্য এই সুযোগটা করে দিয়েছে, তাদের ধন্যবাদ। স্পর্শ যদি আমাদের জন্য ব্রেইল বই প্রকাশ না করত তাহলে আমরা সাহিত্যের স্বাদ গ্রহণ করতে পারতাম না। শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হতো। সে জন্য স্পর্শের কাছে অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা।’
মিরপুর আইডিয়াল গার্লস স্কুলের নবম শ্রেণির দৃষ্টিহীন ছাত্রী সাদিয়া ইসলাম বীথি এসেছে মায়ের সঙ্গে। দৃষ্টিহীনদের জন্য বইমেলায় এমন আয়োজন থাকায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বীথি বলে, ‘আগে আমি শুধু পাঠ্যবই পড়তাম, গল্প, কবিতা, উপন্যাস পড়তে পারতাম না। স্পর্শ বইমেলায় আমাদের জন্য বই পড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। না হয় আমরা বইমেলার আনন্দটা থেকে বঞ্চিত হতাম। আমি প্রতিদিন মেলায় আসি, নতুন নতুন বই পড়ি। আমার কাছে খুবই ভালো লাগে। বইমেলায় অংশ নেওয়া প্রতিটি প্রকাশনায় যেন আমাদের জন্য প্রতি বছর একটি করে হলেও ব্রেইল বই রাখে সে প্রত্যাশা করছি।’
সাদিয়ার মা তাসলিমা আক্তার লিপি বলেন, ‘আমার দুইটা মেয়েই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। সবাই বইমেলায় এসে বই পড়তে পারলেও তারা পড়তে পারে না। পরে জানলাম যে স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনা এই সুযোগটা রেখেছে। এখন মেয়েদের আমি মেলায় নিয়ে আসি, তারা বই পড়ে। এটি দেখতেও আমার ভালো লাগে। স্পর্শকে অনেক ধন্যবাদ।’
স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনার প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি নাজিয়া জাবীন দৃষ্টিহীন মানুষদের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বলতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘আমি এদের বলি দৃষ্টিজয়ী। কারণ এদের চোখের আলো না থাকলেও এরা মনের আলো দিয়ে দৃষ্টিকে জয় করেছে। শুরুর গল্প জানিয়ে মিসেস জাবীন বলেন, ‘শিশুদের নিয়ে লেখা আমার একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল বইমেলায়। তখন বইটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুরা হাতে নিয়ে পড়তে পারেনি। এ ব্যাপারটি আমার কাছে অনেক খারাপ লেগেছিল। অন্য বাচ্চারা পড়তে পারবে কিন্তু এই বাচ্চারা পড়তে পারবে না, বইয়ের মধ্যে এ রকম পার্থক্য কেন থাকবে? এ জন্য ২০০৯ সালে আমার লেখা একটি ব্রেইল বই প্রকাশ করি। ২০১০ সালে আবার আরেকটি ব্রেইল বই প্রকাশ করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১১ সালে এসে আমার মনে হলো, ওরা শুধু আমার বই কেন পড়বে? সারা পৃথিবীর বই পড়বে। ওদের জন্য সারা পৃথিবীর বইয়ের দুয়ার খুলে দিতে হবে। বই পড়া ও জ্ঞান অর্জনের অধিকার তো সবার সমান। সেই হিসেবে তাহলে ওদের কেন অধিকার আমরা দেব না? এ চিন্তা মাথায় রেখেই আমরা বাংলা একাডেমিতে যুক্ত হলাম। যাতে মানুষ এ ব্যাপারে জানে। এ বছর আমাদের ১৯টি নতুন বই এসেছে। মোট ব্রেইল বই আছে ১৩১টি।
গতকাল ছিল শনিবার অমর একুশে বইমেলার দশম দিন। মেলা শুরু হয় বেলা ১১টায় এবং চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত ছিল শিশুপ্রহর। গতকাল নতুন বই এসেছে ১৫২টি। বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি। সুচিত্রা মিত্র শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাইম রানা। আলোচনায় অংশ নেন আহমেদ শাকিল হাসমী ও অণিমা রায়। সভাপতিত্ব করেন মফিদুল হক।
আজকের সময়সূচি : আজ ১১ ফেব্রুয়ারি রবিবার অমর একুশে বইমেলার ১১তম দিন। মেলা শুরু হবে বিকেল ৩টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। আলোচনা অনুষ্ঠান : বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি কলিম শরাফী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সরওয়ার মুর্শেদ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন মাহমুদ সেলিম এবং গোলাম কুদ্দুছ। সভাপতিত্ব করবেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।