বাংলাদেশে চিকিৎসা নিতে আসা প্রথম বিদেশি রোগী ভুটানের কারমা দেমার চিকিৎসা শেষ হয়েছে। তার নাক গহ্বরে ক্যানসার হয়েছিল। ভারতের টাটা মেমোরিয়ালে চিকিৎসায় ক্যানসারমুক্ত হলেও রেডিওথেরাপিজনিত কারণে নাকে পচন ধরে ও নাক নষ্ট হয়ে যায়। এই রোগী আবার নাক তৈরির জন্য টাটা মেমোরিয়ালে ভর্তি হন। কিন্তু দুবার অস্ত্রোপচার করেও নাক পুনর্গঠনে ব্যর্থ হন সেখানকার চিকিৎসকরা। পরে রোগী বাংলাদেশে আসেন এবং রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। এখানকার চিকিৎসকরা জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার নাক পুনর্গঠন করেন। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি দেশে ফিরে যাবেন।
গতকাল শনিবার ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন কারমা দেমার সফল অস্ত্রোপচার ও সুস্থ হওয়ার তথ্য জানান। এ সময় ভুটানের রাষ্ট্রদূত রিং চেং কুইং সিল, ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. রায়হানা আওয়াল ও ভুটানের রোগী কারমা দেমা উপস্থিত ছিলেন।
পরে কারমা দেমার অস্ত্রোপচার দলের একটির প্রধান ইনস্টিটিউটের মাইক্রো সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রদীপ চন্দ্র দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রাথমিক চিকিৎসা শেষ। অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই তাকে ছুটি দেওয়া হবে। তবে নাকের আকার আরও নিখুঁত করতে তাকে আবার একমাস পর আসতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসকদের মান বিশ্বের কোনো দেশের তুলনায় কম নয়। শুধু সুযোগের অভাবে চিকিৎসকরা সেটি তুলে ধরতে পারেন না। বাংলাদেশের চিকিৎসকদের বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের মতো সুযোগ দেওয়া গেলে এই চিকিৎসকরাই তাদের যোগ্যতা বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারবেন। নাকে ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে ভুটানের ২৩ বছর বয়সী মেয়ে কারমা দেমার সফল চিকিৎসায় বাংলাদেশি চিকিৎসকরা প্রমাণ করে দিয়েছেন, বিদেশ থেকেও খুব শিগগির দলে দলে মানুষ বাংলাদেশে চিকিৎসা নিতে আসবেন এবং বিদেশিদের উপযুক্ত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সেই সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বিদেশে আমাদের দেশের মানুষ নিয়মিতই চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন। অনেক টাকা খরচ করে কেউ কেউ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। অথচ আমরা আজ ভুটান থেকে চিকিৎসা নিতে আসা কারমা দেমার চিকিৎসা করলাম। তার এই চিকিৎসা সম্ভব নয় বলে ভারত ও অন্যান্য অনেক দেশ থেকে বলে দিয়েছিল। অথচ আমরা বাংলাদেশ থেকে তার চিকিৎসা সফলভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হলাম। রোগী সুস্থ অবস্থায় এখন ভুটান চলে যেতে পারবেন।’
ভুটানের ২৩ বছর বয়সী রোগী কারমা দেমার চিকিৎসার জটিলতা সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এই রোগীর চিকিৎসা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন ও জটিল কাজ। এর আগে ভারতে ও ভুটানে তার অপারেশন হয়েছিল, থাইল্যান্ডেও সে চিকিৎসা নিয়েছিল। কিন্তু সেসব অপারেশন সফল না হওয়ায় পরবর্তী অপারেশন করাটা ছিল ভীষণ জটিল, ঝুঁকিপূর্ণ ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ কারণে অনেক দেশই তার জন্য নতুন করে আরেকটি অপারেশন করার সাহস করতে পারেনি। আমরা এটিকে দেশের ভাবমূর্তির প্রশ্ন ধরে নিয়ে চিকিৎসা বোর্ড করে এই অপারেশন কাজে হাত দিই। দীর্ঘ সময় নিয়ে শরীরের অন্য জায়গা থেকে রক্তসহ মাংস, হাড় কেটে নাকে লাগিয়ে দেওয়া এবং নাকের রক্ত সঞ্চালন ঠিক রাখাটা ছিল রীতিমতো চ্যালেঞ্জের কাজ। সেই কঠিন কাজটি আমাদের চিকিৎসকরা সফলতার সঙ্গে করে দেখিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের দেশের চিকিৎসাসেবার জন্য বিরাট এক অর্জন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এখন এ রকম সফলতার পর ভুটানেও ১৫ শয্যার বার্ন ইনস্টিটিউট করার ব্যাপারে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। নেপালসহ অন্য সার্কভুক্ত দেশগুলোতেও এ-রকম জটিল চিকিৎসাসেবা আমাদের চিকিৎসকদের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়াসহ বিদেশি রোগীদের দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা হচ্ছে।
সম্মেলনে ভুটানের রাষ্ট্রদূত মি. রিং চেং কুইং সিল বলেন, এই জটিল অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন করে বাংলাদেশ সেটিই করে দেখিয়েছে যা বিশ্বের অন্য দেশ পারেনি। বিশ্বের অন্য দেশগুলো যখন বলেছিল এই অপারেশন সম্ভব নয়, তখন বাংলাদেশ বলেছিল সেটি সম্ভব, এবং বাংলাদেশ সেই অসম্ভব কাজকে সম্ভব করেছে। এজন্য আমরা বাংলাদেশের জনগণ, সরকার ও চিকিৎসকদের কাছে কৃতজ্ঞ।
রোগী কারমা দেমা বলেন, যখন আমি সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম, তখন বাংলাদেশের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট ও বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং সফল চিকিৎসা দিয়েছেন। এজন্য আমি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ।
উল্লেখ্য, কারমা দেমা বাংলাদেশে চিকিৎসা নিতে আসেন গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর। গত ৯ জানুয়ারি তার সফল অস্ত্রোপচার হয়। তিনি বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় আছেন।