ভাগ্য বদলানোর জন্য সৌদি আরবে গিয়েছেন নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার মোহাম্মাদ শহীদ মোল্লা (৩৫)। এখন তার জীবন কাটছে বন্দিশালায়; সৌদির জিজান শহরের একটি অন্ধকার কক্ষে। বছরখানেক আগে তার আকামার মেয়াদ শেষ হয়েছে। টাকার অভাবে নতুনভাবে আকামা করতে পারছেন না।
২০২০ সালের শেষের দিকে ৫ লাখ টাকা ঋণ করে লোহাগড়ার রোমান শেখের মাধ্যমে তিনি সৌদি আরবে যান। যাওয়ার পর রোমান শেখ তাকে দাম্মামের মরুভূমিতে কাজ করতে নিয়ে যান। এক সপ্তাহ কাজ করার পর রোমান শেখ তাকে রেখে পালিয়ে যায়। অতঃপর সেখানে পাঁচ দিন মানবেতর দিন কাটে তার। পরে এলাকার এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে সেখান থেকে পালিয়ে জিজান শহরে যান।
তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে থাকতে অন্তত তিনবেলা খেতে পারতাম। এখন তিনবেলার জায়গায় দুইবেলা খেতে হয়, পালিয়ে বেড়াতে হয় এক শহর থেকে আরেক শহরে। আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অবৈধ প্রবাসী হিসেবে সৌদিতে আছি। রোমান শেখ এক বছর আকামা করে দিলেও কাজ দিতে পারেনি। বরং আমাকে রেখে পালিয়ে যায়। তার কারণে আমাকে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। ফোন দিলে তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ায় আমি দিনে বের হতে পারি না। রাতে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু কাজ করে কোনোরকমে জীবন চলছে।’
অন্ধকার নেমে এসেছে তার পরিবারেও। দেশে স্ত্রী ও দুই সন্তান মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। এনজিও থেকে ২ লাখ টাকা ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলেন তিনি। টাকা শোধ করতে না পারায় তারা তার গ্রামের বাড়িতে তালা লাগিয়েছে। তার স্ত্রী ও দুই সন্তান এখন তার মামার বাড়িতে থাকে। টাকার অভাবে তার মাদ্রাসাপড়ুয়া ছেলের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি দেশেও ফিরতে পারছেন না, নতুনভাবে আকামাও করতে পারছেন না। আকামা করতে লক্ষাধিক টাকা লাগে। দালাল রোমান শেখের খপ্পরে পড়ে তাকে বন্দিজীবন কাটাতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে আরও পাঁচজন বন্দিজীবন কাটাচ্ছে। দালালরা আমাদের নানা আশ্বাস দিয়ে নিয়ে আসে, কিছুদিন পরেই যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।’ শহীদ মোল্লা আকুতি জানান, ‘যেকোনোভাবে দেশে ফিরতে চাই। সরকারের সহযোগিতা চাই। আমার পাসপোর্ট নম্বর: অ০১০৬৪৭৯৮।’
তার মতো অনেক সৌদি আরবপ্রবাসী এখন অবৈধভাবে বসবাস করছেন। তাদের আকামার মেয়াদ শেষ হলেও টাকার অভাবে নতুনভাবে আকামা করতে পারছেন না। তাদের পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তারা এখন অর্থ নয়, দেশে আসার জন্য আহাজারি করছে। কিন্তু টাকার অভাবে দেশে ফিরতে পারছে না। অথচ গত অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি লোক সৌদি আরবে গেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে ওই দেশ থেকে।
সৌদি আরবে প্রবাসীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ‘কফিল’রা। তারা যেভাবে কাজ করতে বলে সেভাবেই কাজ করতে হয়। তাদের কথায় অনেক সময় অতিরিক্ত সময়ে কাজ করতে হয়। অথচ বেতন বাড়ানো হয় না। মাস গেলে নির্ধারিত অঙ্কের টাকা তাদের দিতে হয়। এমনটি জানিয়েছেন মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার মানছারুল ইসলাম, যিনি ২০২২ সালের মার্চ মাসে সৌদি গিয়েছেন। কাজ না পেয়ে তিনিও দেশে ফেরার চিন্তা করছেন। গত দুই মাস ধরে অবৈধ প্রবাসীদের গ্রেপ্তার করছে সৌদি পুলিশ।
সৌদি প্রেস এজেন্সি সূত্রে জানা গেছে, আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের অপরাধে গত মাসে ১৯ হাজার ৩২১ জন অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। আবাসন আইন ভাঙার অপরাধে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪২৭ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছে ৪ হাজার ৬৯৭ জন। কাজ সম্পর্কিত অপরাধে গ্রেপ্তার হয়েছে ৩ হাজার ১৯৭ জন।
গত এক সপ্তাহে ৯ হাজার ৯২৭ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ প্রবাসীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। গত ৪ থেকে ১০ জানুয়ারি সৌদির বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
আবাসন, শ্রম ও সীমান্ত আইন লঙ্ঘনের দায়ে সৌদি আরবে বর্তমানে ৫৪ হাজার ৪৪৯ জনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। আটককৃত প্রবাসীদের মধ্যে ৪৭ হাজার ৯৭৭ জনকে দেশে ফেরত পাঠানোর আগে ভ্রমণের প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহের জন্য তাদের নিজ নিজ কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেক বাংলাদেশি রয়েছেন বলে জানা গেছে।
প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক ও বিমানবন্দরকল্যাণ ডেস্কের তথ্যমতে, গত এক মাসে প্রায় দুই হাজারের মতো শ্রমিক সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের অধিকাংশের আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরেছেন তারা।
বিএমইটির তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে ১০ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে যান। ২০২২ সালে বিভিন্ন দেশে যান ১১ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি কর্মী। ২০২৩ সালে বিদেশে গেছেন ১৩ লাখের বেশি কর্মী। অনেক প্রবাসীই ‘ব্যর্থ’ হয়ে দেশে ফিরেছেন।
দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। তবে সব হারিয়ে, বিদেশে পুলিশের হাতে আটক হয়ে, একরকম বাধ্য হয়ে, শূন্য হাতে যারা আসে তাদের হিসাব পাওয়া যায়। কারণ এমন প্রবাসীর হাতে পাসপোর্ট থাকে না। দেশে ফেরার জন্য দূতাবাস থেকে তাদের একটি আউট পাস (ভ্রমণের অনুমতিপত্র) সরবরাহ করা হয়।
সরকারের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে শূন্যহাতে দেশে ফিরেছে ৮৬ হাজার ৬২১ জন। পুরুষ ৮৩ হাজার ৭১৯ ও নারী ২ হাজার ৯০২ জন। যারা পাসপোর্ট নিয়ে দেশে ফিরেছেন তাদের কোনো হিসাব নেই এ সংস্থার কাছে।
অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যর্থ অভিবাসনের প্রকৃত চিত্র আরও নাজুক। বছরে এ সংখ্যা লাখের বেশি হবে। ফিরে আসা ২১৮ প্রবাসীর ওপর সম্প্রতি একটি জরিপ চালিয়েছে অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)। তারা বলছে, বিদেশে গিয়ে কোনো কাজ পাননি ১৫ শতাংশ কর্মী। ২০ শতাংশ কর্মী চুক্তি অনুসারে কাজ পাননি। তাদের দেশে ফিরে আসা ছাড়া উপায় ছিল না।
রামরুর জরিপে অংশ নেওয়া কর্মীদের ১৫ শতাংশ বিদেশে যাওয়ার এক মাসের মধ্যে দেশে ফেরেন। আর ছয় মাসের মধ্যে দেশে ফেরেন ২৯ শতাংশ কর্মী। বিদেশে গিয়ে কাজ পেতে ব্যর্থ হয়ে ধারদেনায় জড়িয়ে যান তারা।
এ বিষয়ে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৯ সালে ২৫ হাজার ৭৮৯ বাংলাদেশিকে সৌদি আরব থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। নতুন বছরে এক মাসে প্রায় দুই হাজারের মতো বাংলাদেশি ফিরেছেন। ফেরত আসাদের বিবরণ প্রায় একইরকম। প্রায় সবাই খালি হাতে ফিরছেন। কয়েক মাস আগে গিয়েছিল এমন লোকও কাজ না পেয়ে ফিরেছেন।
তিনি বলেন, ‘মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে প্রবাসীরা বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন। গ্রামের লোকজনদের অর্থের লোভ দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে প্রতারণা করা হয়। তারা দক্ষ না হওয়ার কারণেও বিপদে পড়ে। তাদের ব্যাপারে বিএমইটির জোরালো ভূমিকা পালন করা উচিত। যাতে তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে হেনস্তার শিকার না হন। এর প্রভাব কিন্তু রেমিট্যান্সে পড়ে।’
সৌদি আরবের জিজান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রবাসী এবং অভিবাসীবিষয়ক গবেষক ড. হোসাইন আহমেদ লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে অনেক লোক সৌদি আরবে আসে ভালো জীবনযাপনের উদ্দেশ্যে। কিন্তু ভাষাদক্ষতা ও সুনির্দিষ্ট কাজের পরিকল্পনা না থাকায় তাদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে। দালালদের খপ্পরে পড়েও তাদের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। এরকম অনেক প্রবাসী এখন সৌদি আরবে আছে। তারা স্থানীয় প্রশাসনের ভয়ে বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না। আমি গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি, অধিকাংশ শ্রমিক দালালদের মুখের কথায় দেশ ছাড়ে। বিদেশে এসে দিশেহারা হয়ে পড়ে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উচিত বিষয়গুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা। যারা ধোঁকা দিয়ে টাকা কামায় তাদের শাস্তির আওতায় আনা। নয়তো এ ব্যাপারে শ্রমিকদের অনীহা তৈরি হবে।’