৩৪ কোটির চার যন্ত্র অচল

কম খরচে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল। ৮৫০ শয্যার সরকারি হাসপাতালটিতে প্রতিদিন ভর্তি থাকে তিন হাজারের বেশি রোগী। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেয় সাড়ে তিন হাজার রোগী। অথচ এ চিকিৎসাকেন্দ্রে বছরের পর বছর ধরে বিকল প্রায় ৩৪ কোটি টাকার চারটি যন্ত্র।

চমেক সূত্র জানায়, ক্রয়চুক্তিতে সিটি স্ক্যান মেশিনের সাত বছর ও ল্যাসিক মেশিনের পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি ছিল। তা শেষ হওয়ার আগেই অকেজো এ দুটি মেশিন। ছয় বছর চার মাস ধরে অচল ল্যাসিক, আড়াই বছর ধরে অচল এমআরআই ও এনজিওগ্রাম মেশিন এবং ছয় মাস ধরে বিকল সিটি স্ক্যান মেশিন।

কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, যন্ত্রগুলোর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেডিটেল প্রাইভেট লিমিটেডের সরকারনির্ধারিত মূল্যে মেরামতে রাজি না হওয়া, রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির শর্ত না মানা এবং প্রতারণা ও দায় এড়ানোর মনোভাবের কারণে যন্ত্রগুলো অচল পড়ে আছে। চিকিৎসকদের কেউ কেউ এ পরিস্থিতির জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের উদাসীনতাকেও দায়ী করেছেন।

মেডিটেল প্রাইভেট লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক পঙ্কজ কুমার পাল গতকাল বুধবার দুপুরে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনেক কথাই বলতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আজ (বুধবার) জাপান থেকে নতুন সিটি স্ক্যান মেশিন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসেছে। আগামী শনিবার চমেক হাসপাতালে সেটি বসানো হবে। এমআরআই মেশিনও ঠিক হয়ে যাবে।’

জানা গেছে, ১০ কোটি টাকা মূল্যের এমআরআই ও প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা মূল্যের সিটি স্ক্যান মেশিন সরবরাহ করেছিল মেডিটেল। তারা ঢাকার একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। ২০১৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সিটি স্ক্যান ও ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট এমআরআই মেশিন চালু করা হয়। ক্রয়চুক্তি অনুযায়ী সিটি স্ক্যানের ওয়ারেন্টি সাত বছর।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান বলেন, ‘সিটি স্ক্যান ও এমআরআই মেশিন রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের জন্য বছরে ক্রয়মূল্যের সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারে টাকা নেওয়ার কথা মেডিটেলের। কিন্তু তারা দ্বিগুণ মূল্য দাবি করেছে। এ কারণে মেরামতের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। বাড়তি টাকা চাওয়া তথা সিএমসি নিয়ে জটিলতার কারণে ঝুলে আছে যন্ত্রগুলো সচল করার কাজ। সরবরাহকদের ব্যয়প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়।’

সূত্র বলছে, বিকল যন্ত্রগুলো মেরামতের বিষয়ে এ পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ঔষধাগার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে ৬৯ বার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অগ্রগতি নেই। ফলে রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

চমেক হাসপাতালের রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সুভাষ মজুমদার বলেন, ‘এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিন বন্ধ থাকায় সাধারণ রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।’

ফটিকছড়ির বাসিন্দা মহব্বত খান গত ১২ ফেব্রুয়ারি মেরুদ-ে ও বুকে ব্যথা অনুভব করেন। স্বজনরা তাকে নিয়ে আসে চমেক হাসপাতালে। চিকিৎসকরা তাকে এনজিওগ্রাম করার পরামর্শ দেন। ওই যন্ত্রটি অচল থাকায় তিনি প্রয়োজনীয় সেবা পাননি। পরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ১৬ হাজার টাকায় এনজিওগ্রাম পরীক্ষা করান। হাসপাতালে আসা আরও অনেক রোগী শহরের বেসরকারি বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে বাড়তি টাকায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছে।

সেবাবঞ্চিত ২২ হাজার রোগী : জানা গেছে, সচল অবস্থায় প্রতিদিন ৩০-৪০ রোগীর এমআরআই পরীক্ষা হতো। এজন্য খরচ হতো আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। বেসরকারি ল্যাবগুলোতে খরচ হয় ৫ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা। প্রতিদিন ২০-২২ রোগীর এনজিওগ্রাম পরীক্ষা হতো। আড়াই বছর ধরে অচল থাকায় তারা চিকিৎসা সেবাবঞ্চিত হয়েছেন।

জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালের মেডিকেল যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের। এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি প্রতিষ্ঠান। সরকারি হাসপাতালের কোনো চিকিৎসাযন্ত্রের বিক্রয়োত্তর সেবার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে এ প্রতিষ্ঠানটি।

চমেক হাসপাতালের এমআরআই যন্ত্রটির দাম ৯ কোটি ৮৪ লাখ ৩২ হাজার টাকা। যন্ত্রটি সরবরাহ করে মেডিটেল প্রাইভেট লিমিটেড। এমআরআই যন্ত্রে প্রথম ত্রুটি দেখা দেয় ২০২২ সালের জুন মাসে।

শর্ত মানছে না সরবরাহক : স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের সঙ্গে মেডিটেল প্রাইভেট লিমিটেডের যে রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি হয়েছিল তাতে তিনটি শর্ত ছিল; পাঁচ বছর পর্যন্ত সফটওয়্যার আপগ্রেড ও রিপ্লেসমেন্ট করতে হবে এবং দশ বছর পর্যন্ত সার্ভিস ব্যাকআপ দিতে হবে। শর্তগুলো মেডিটেল মানছে না বলে অভিযোগ চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসানের।

তিনি জানান, এমআরআই যন্ত্র সচল করতে চমেকের কাছে ৯৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা দাবি করে মেডিটেল। ২০২৩ সালের ১২ অক্টোবর চমেকের কাছে তিন বছরের সিএমসি বাবদ ৩ কোটি ৯৮ লাখ ৪১ হাজার ৭০ টাকা দাবি করে। তাদের সিএমসির প্রাক্কলিত দর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত গাইডলাইনের চেয়ে ২৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা বেশি, যা ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জারি করা পরিপত্রের পরিপন্থী।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি পরিপত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী এমআরআইয়ের সিএমসি যন্ত্রের প্রকৃত মূল্যের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু তা মানছে না মেডিটেল। মেডিটেলের বক্তব্য, ২০১৬ সালে এমআরআই মেশিন আমদানির সময় কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল তাতে মন্ত্রণালয়ের মেরামত খরচ নির্ধারণ করে দেওয়ার বিষয়টি ছিল না।

মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে ৬৯ বার চিঠি : এমআরআই সচলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ২০২২ সালের জুন থেকে এ পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে ২৮ বার এবং ল্যাসিক মেশিন সচলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয়ে ৪১ বার চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বশর মোহাম্মদ খুরশিদ আলম ও সংস্থাটির পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আবুল হোসেইন মো. মঈনুল আহসানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও পাওয়া যায়নি।

ওয়ারেন্টি শেষ হওয়ার আগেই অচল সিটি স্ক্যান : চমেকের সিটি স্ক্যান মেশিনের ওয়ারেন্টির মেয়াদ সাত বছর; অর্থাৎ ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওয়ারেন্টি ছিল। এর ৩ বছর ৩ মাস ২১ দিন আগেই গত বছর ৬ জুন অচল হয় সিটি স্ক্যান। ১৭ দিন পর পুনরায় সচল করা হলে ২ মাস ১৯ দিনের মাথায় মেশিনটি ফের অচল হয়ে যায়। গত ছয় মাস ধরে অচল রয়েছে যন্ত্রটি।

মেডিটেলের প্রতারণা! : চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, সিটি স্ক্যান মেশিনের নষ্ট টিউবটি ফের ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার সময় চমেক কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ায় প্রতারণার আশ্রয় নেয় মেডিটেল। হাসপাতালের পরিচালককে লেখা অনুমতি প্রার্থনার চিঠির একটি লাইনে মেশিন নষ্টের জন্য সেটির ‘আর্থিং কেব্ল’ চুরির কথা জানায় মেডিটেল। চিঠির ওই লাইনটি প্রথমে নজরে না এলেও পরে পরিচালকের নজরে আসে। পরে আরেকটি চিঠিতে মেডিটেল নিজেদের ভুল স্বীকার করে প্রথম চিঠিটি প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু ‘অসৎ’ উদ্দেশ্যে প্রথম চিঠির একটি ফটোকপি রেখে দেয়। গত বছর ২৬ ডিসেম্বর সিটি স্ক্যান মেশিনের ইনভার্টার ও কনভার্টার ফের ঢাকায় নিয়ে যায় তারা। গত ১৬ জানুয়ারি যন্ত্রাংশ দুটির ত্রুটি আছে বলে জানায় মেডিটেল। এবার সিটি স্ক্যান মেশিন সচল করতে ১ কোটি ৫৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি করে তারা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চাপ : গত ২৮ জানুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন চমেক হাসপাতাল সফরে এলে সিটি স্ক্যান মেশিনটি অচল থাকার কথা জানান হাসপাতালের পরিচালক। দ্রুত মেশিন সচল করে দেওয়ার জন্য মেডিটেলকে তাগাদা দিতে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার কর্তৃপক্ষকে ফোন করেন স্বাস্থ্য সচিব। এরপর মেরামতের খরচের দাবি থেকে সরে গিয়ে ৩০ জানুয়ারি সিটি স্ক্যান মেশিন সচল করার পদক্ষেপের কথা কেন্দ্রীয় ঔষধাগার কর্তৃপক্ষকে জানায় মেডিটেল। দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও মেডিটেল প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি।

সাড়ে ৬ বছর ধরে অচল ১১ কোটির ‘ল্যাসিক’ মেশিন : চমেক হাসপাতালে ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চক্ষু বিভাগে স্থাপন করা অত্যাধুনিক ১১ কোটি টাকা দামের ‘ল্যাসিক’ মেশিন অচল হয়ে আছে। ওয়ারেন্টি শেষ হওয়ার আগেই মেশিনটি অচল হয়েছে। এটির ওয়ারেন্টি ছিল পাঁচ বছরের। এটির সরবরাহক এসপি ট্রেডিং। মেশিনটি সচল করার তাগিদ দিয়ে এসপি ট্রেডিংসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ৪১ বার চিঠি দিয়েছেন চমেকের টেন্ডার শাখার কর্মকর্তা মো. আলী।

আড়াই বছর ধরে অচল এনজিওগ্রাম মেশিন : চমেকের ক্যাথল্যাবে স্থাপন করা এনজিওগ্রাম যন্ত্রটি ২০২১ সালের ৩ অক্টোবর থেকে অচল। যন্ত্রটির একটি এক্স-রে টিউব নষ্ট হওয়ায় সেটি অকেজো হয়ে আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যন্ত্রটির দাম ৪ কোটি ৫৫ লাখ ৬০ হাজার। মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেড যন্ত্রটি চমেক হাসপাতালে সরবরাহ করেছিল।