২০২৫ সালের মধ্যে কুইক রেন্টাল (দ্রুত ভাড়াভিত্তিক) ও অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র ফেজ আউট বা বন্ধের প্রস্তাব করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। একই সঙ্গে জ্বালানি রূপান্তরে সরকারকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া এবং বিদ্যুৎ খাতের দায়মুক্তি আইন বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।
‘বাংলাদেশে জ্বালানি পরিবর্তনের জন্য চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ : একটি নাগরিক ইশতেহার’ শীর্ষক এক সেমিনারে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। গতকাল বুধবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ওই সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে জ্বালানির রূপান্তরে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি, নির্বাচনী ও নাগরিক সমাজের ইশতেহার শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নির্বাচনে জ্বালানির গুরুত্ব আগেও ছিল, আগামীতেও থাকবে। বিগত কয়েকটি নির্বাচনের ইশতেহার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দলগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি আমদানিতে মনোযোগী। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে তাদের মনোযোগ কম। ২০২৫ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা তৈরি এবং স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি রূপান্তর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সিপিডির প্রস্তাবিত স্বল্পমেয়াদি বা আগামী জুনের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে জ্বালানির চাহিদা পূর্বাভাস সংশোধন, স্থানীয় মুদ্রায় মূল্য পরিশোধ, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, সৌরবিদ্যুৎ সামগ্রীতে শুল্ক কমানো, বায়োগ্যাস ব্যবহার করা ইত্যাদি। মধ্যমেয়াদি বা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে কুইক রেন্টাল ও অদক্ষ যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র এখনো বিদ্যমান ‘ফেজ আউট’ তালিকায় নেই, সেগুলো দেরি না করে বন্ধ করা। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অন্তর্ভুক্ত করা, অভিন্ন লক্ষ্যমাত্রাসহ সমন্বিত জ্বালানিনীতি গ্রহণ, প্রকৌশলীদের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা এবং পাওয়ার প্ল্যান্ট ইনডেমনিটি অ্যাক্ট বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দায়মুক্তি আইন বাতিল।
এ ছাড়া জ্বালানির জন্য আলাদা সেল করা, সাসটেইনেবল রিনিউবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (স্রেডা) ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) শক্তিশালী করাসহ একাধিক দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাব দিয়েছে সিপিডি।
সেমিনারে সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয় বলেন, ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি এখন মানুষের অন্ন-বস্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ যখন ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণ করে তখন বিদ্যুৎ নিয়ে অনেকটা যুদ্ধাবস্থার মতো ছিল। বিদ্যুতের দাবিতে মানুষ বিক্ষোভ করেছে। এখন সেই পরিস্থিতি আর নেই।’ তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো চাহিদা অনুযায়ী দেশের মানুষকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা। নীতি পরিবর্তন কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার করলেই সমস্যা থাকবে না এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। চাইলে সব বদলে দেওয়া যাবে সেটিও সম্ভব নয়।
প্যানেল আলোচক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম তামিম বলেন, ‘জ্বালানি রূপান্তরের বিষয়টি অনেক ভেবে করতে হবে। আমাদের পরিবেশ ও বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। অন্য দেশের সঙ্গে মেলাতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে চীন ও ভারত। আবার তাদের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও অনেক বেশি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ঝুঁকি ও সম্ভাবনা বিবেচনা করতে হবে।’
বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের দায়মুক্তির বিশেষ বিধান আইনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘২০১২ সালের বাস্তবতায় আইনটির প্রয়োজন ছিল। আমি তখন সমর্থন করেছিলাম। কিন্তু এখনকার বাস্তবতায় এটার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।’
অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, ‘দেশে নতুন গ্যাস পাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তাই জ্বালানি অনুসন্ধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’
বিদ্যুৎ বিভাগের উন্নয়ন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘জনগণের চাহিদার কথা মাথায় রেখে সবদিক বিবেচনা করে সরকার কাজ করছে। অনেক সময় আলোচনা এমন হয় যেন সরকার কিছুই করছে না। অফগ্রিডের সৌরবিদ্যুৎ যোগ করলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিমাণ ৫ শতাংশ হয়। কয়লা বলেন, সৌরবিদ্যুৎ বলেন সব জায়গায় সংকট জমি। বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য তিন হাজার মেগাওয়াটের এলওআই ইস্যু করা হয়েছে। দেখা যাবে এক হাজারও আসতে পারছে না। আর সরকারি খাতে যা দিচ্ছি সবটাই হবে।’
এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল-ই-এলাহী চৌধুরী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জ্বালানিনীতি অনুসরণ করলেই দেশে বিদ্যুৎ, জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু আমরা সেই নীতি থেকে অনেকখানি সরে এসেছি।’
অন্যদের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, অ্যাকশন এইডের এনার্জি ট্রানজিশন বিভাগের ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ।