রাজধানীতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে তিনটি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। যথাযথ নিরাপত্তাবিধি না মেনে কাজ করায় এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে; তবু ঝুঁকি নিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। ভারী যন্ত্রপাতি ও নির্মাণকাঠামো ব্যবহার করা হলেও সতর্কতা অবলম্বন করতে দেখা যায়নি জনাকীর্ণ এলাকায়। ফলে মনে ভয় নিয়ে চলেন পথচারীরা। আরও মৃত্যুর শঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংবা তদারককারী কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে উদাসীন। তারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড দূরে থাক, প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডই মানে না, ফলে এরকম দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।
নির্মাণকাজের স্থান যথাযথ নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় নিয়ে আসা এবং সঠিকভাবে দৃশ্যমান করার জন্য সাইন, সিগন্যাল, মার্কিং, লাইটিং ও রিফ্লেকটর ব্যবহার করার নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ নির্মাণ এলাকাতেই সেসব দেখা যায় না। তাই মানদণ্ডহীন অনিরাপদ নির্মাণকাজের কারণে বারবার একই দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মগবাজারের দিলু রোড এলাকায় এক্সপ্রেসওয়ের স্টিলের কাঠামো ভেঙে পড়লে মতিউর রহমান (৫০) নামে এক হকার নিহত হন। মতিউর ফেরি করে গামছা বিক্রি করতেন। হাতিরঝিল থানা পুলিশ জানিয়েছে, মতিউর দিলু রোড দিয়ে যাচ্ছিলেন। সে সময় নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের স্টিলের কাঠামোর একটি অংশ ভেঙে তার মাথায় পড়ে। এ ঘটনায় প্রকল্পের ওই অংশের সেফটি ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনায় হওয়া মামলার তদন্ত করছে পুলিশ।
গত সোমবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ভারী যন্ত্রপাতি ও নির্মাণ কাঠামো ব্যবহার করে চলছে নির্মাণকাজ। এ পথে চলাচলকারী পথচারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। রেললাইন ধরে চলছে মগবাজারমুখী এক্সপ্রেসওয়ের এ অংশের কাজ।
বিশালাকৃতির কাঠামোর ওপর শ্রমিকরা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কাজ করছেন। তার নিচেই পথচারীরা হেঁটে যাচ্ছেন। কারওয়ান বাজারসহ অন্য এলাকার এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণের কাজও চলতে দেখা গেছে। তেজগাঁও এলাকার বাসিন্দা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘কাজ শুরুর পর থেকেই সাবধানে চলাচল করি। তারা মালামাল, যন্ত্রপাতি চারদিকে ছড়িয়ে রেখে কাজ করে। কখন কোনটা গায়ে এসে পড়ে সে ভয়ে থাকি।’
হকার মতিউর রহমানের মৃত্যুর দুদিন পর ৯ ফেব্রুয়ারি খবর আসে আরেক মৃত্যুর। নিহত শামিম মিয়া (৩৯) এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণশ্রমিক। এক্সপ্রেসওয়ের তেজকুনিপাড়া অংশে ক্রেন থেকে কনটেইনার পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে। ক্রেন অপারেটর আজহারুল ইসলাম সোহাগকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত বছর ২৯ মে রাজধানীর মহাখালী এলাকায় এক্সপ্রেসওয়ে থেকে মাথায় রড পড়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। এ ঘটনায় শ্রমিক মো. হাসানের (৩২) বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ এনে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের বনানী-মহাখালীর অংশের সাইট ম্যানেজার হাসিব হাসান মামলা করেন। এ ঘটনার তদন্ত করে রেলওয়ে পুলিশ।
এসব বিষয়ে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক এএইচএমএস আকতারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তার মন্তব্য জানা যায়নি।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের বড় প্রকল্প কাজে কঠোর নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে করতে হয়। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তাবিধি মেনে কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের। সঠিকভাবে তা হচ্ছে না বলেই বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। নিরাপত্তায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা যাচাই করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা দরকার।’