বগুড়ার আদমদীঘিতে খাদ্য অধিদপ্তরের সান্তাহার সাইলোতে (গুদাম) ব্যবহার অনুপযোগী যন্ত্রপাতি ও মালামাল বিক্রিতে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি দপ্তরের কোনো সরঞ্জাম ব্যবহারের অনুপযোগী হলে সরাসরি বিক্রির নিয়ম নেই। ব্যবহারের অনুপযোগী মালামালের মূল্য নির্ধারণসহ বিভিন্ন নিয়মাবলি জুড়ে দেওয়া হয় দরপত্রে। তারপর ডাকা হয় নিলাম। কিন্তু সব নিয়ম তো মানাই হয়নি, উল্টো দরপত্র হওয়া অকেজো ১৯ প্রকারের যন্ত্রপাতি ও মালামাল সাইলো অধীক্ষের কার্যালয় থেকে কোনো প্রকার ওজন ছাড়াই ক্রেতাকে সরবরাহ করা হয়েছে।
সাইলো অধীক্ষক কার্যালয়ের সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে পরিচিত শাহরিয়ার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন চৌধুরী নিয়মের তোয়াক্কা না করে নিজের ক্ষমতাবলে ওইসব মালামাল আওয়ামী লীগ নেতা এক কাউন্সিলরকে সরবরাহ করেছেন বলে অভিযোগ। যদিও সরকারি ওয়েব সাইটে তার পদবি উল্লেখ আছে রক্ষণ প্রকৌশলী ও আহরণ-ব্যয়ন কর্মকর্তা।
সাইলোর সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করে বলেন, দরপত্র অনুযায়ী আট টনের মতো ১৯ প্রকার যন্ত্রাংশ ও মালামাল সরবরাহের কথা ছিল। কিন্তু কোনোরকম ওজন ছাড়াই গত বুধবার ১০ বছরে জমা হওয়া ৩৫-৪০ টন মালপত্র সরবরাহ করা হয়। আর দরপত্রে উল্লিখিত দর অনুযায়ী এসব মালামাল বিক্রি হয়েছে মাত্র ৯৫ হাজার ৫৮৫ টাকায়, যা শাহরিয়ার মোহাম্মদ সালাউদ্দিন চৌধুরী একক ক্ষমতাবলে নিজের ইচ্ছেমতো করেছেন। এ খবর জানাজানি হলে বিষয়টি শহর জুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি সান্তাহার সাইলোর অকেজো যন্ত্রাংশ ও মালামাল বিক্রির জন্য জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সেই দরপত্রে জিআই পাইপ কেজিতে, জিপ গাড়ির ব্যাটারি সংখ্যায়, স্ক্র্যাপ ম্যাটেরিয়াল, কনভেয়ার বেল্ট, বাঁশ ও কাঠ টন হিসেবে এবং আরও প্রায় ১৯ প্রকার মালামাল কেজি বা টন অথবা সংখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে। আর এসব মালামাল দরপত্রের মাধ্যমে মাত্র ৯৫ হাজার ৫৮৫ টাকায় কেনেন ঠিকাদার রেজাউল করিম ডাবলু। তিনি বগুড়া পৌর আওয়ামী লীগের ৫ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সাধারণ সম্পাদক ও পৌর কাউন্সিলর। গত বুধবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মালপত্র বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু নিয়ম ভঙ্গ করে ওজন ছাড়াই মালামাল সরবরাহের পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ট্রাকে মালামাল তোলার জন্য তাদের নিজস্ব শ্রমিক নিয়ে আসে সাইলোর মতো সংরক্ষিত এলাকায়, যা নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয় সাইলোতে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে। এরপর মালামাল ট্রাকে তুলে পাহারা দিয়ে নিয়ে যান স্বয়ং ঠিকাদার রেজাউল করিম ডাবলুসহ আরও কয়েকজন।
এদিকে ওজন ছাড়াই দরপত্রে উল্লিখিত মালামালের চেয়ে অনেক বেশি হস্তান্তর হচ্ছে এমন খবর পেয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা তথ্য সংগ্রহে গেলেও সাইলোর অধীক্ষক (দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) শাহারিয়ার মো. সালাউদ্দীন দেখা করতে রাজি হননি। এ ছাড়া গণমাধ্যমকর্মীদের সাইলোর ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাইলোর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নিয়মানুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের খালি ট্রাক প্রথমে পরিমাপ যন্ত্র দিয়ে (স্কেল) ওজন করতে হবে। এরপর ঠিকাদারকে মালপত্র বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য মালভর্তি ট্রাক ফের ওজন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষর নিয়ে হস্তান্তর করতে হবে। সেই নিয়ম অনুযায়ী সাইলোর একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী সুপারকে ট্রাকটি ওজন করে মালামাল বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি (সাইলো অধীক্ষক) ওজন ছাড়াই মালপত্র সরবরাহ করেন।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সহকারী সাইলো অপারেটিভ মাসুদ রানা ওজন করে মালামালগুলো সরবরাহ না করার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘দরপত্রে উল্লিখিত ওজন ও সংখ্যা অনুযায়ী আনুমানিকভাবে মালপত্রগুলো সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রথমে ১৯ প্রকারের হলেও পরে ১৮ প্রকারের মালপত্র দরপত্র অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়।’ অতিরিক্ত মালামাল দেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে মাসুদ রানা বলেন, ‘তালিকা অনুযায়ী ১০ বছর আগের ওইসব অকেজো মালপত্রই সরবরাহ করা হয়েছে। আর বর্তমানে নতুন করে যেসব মালপত্র জমা হয়েছে, সেগুলো গুদামে সংরক্ষণ করা হয়েছে।’
সংরক্ষিত এলাকায় বাইরের শ্রমিক ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যক্তিগত শ্রমিক নিয়ে এলেও পরে আমাদের কথায় সাইলোর কয়েকজন শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করেন।’
অকেজো মালামালগুলো সরবরাহের আগে ওজন করা হয়নি বলে স্বীকার করেন আরেক সাইলো অপারেটিভ সঞ্জয় কুমার। তিনি বলেন, ‘কমিটি যে মালামালগুলো দেখিয়ে দিয়েছিল সেগুলোই সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়া এই বিষয়টি অনেকের মধ্যেই জানাজানি হয়েছে। অনেকদূর গড়িয়েছে। অধিদপ্তর ও মিনিস্ট্রি থেকে ফোন দিয়েছিল। ওনাদের কাগজপত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু লোক তিলকে তাল করার চেষ্টা করছে।’
ঠিকাদার রেজাউল করিম ডাবলু বলেন, ‘নিয়মের বাইরে আমি মালপত্র নিতে পারব না। দরপত্র অনুযায়ী কর্র্তৃপক্ষের কাছ থেকে মালামালগুলো বুঝে নিয়েছি।’
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে সাইলোর সুপারিনটেনডেন্ট শাহারিয়ার মো. সালাউদ্দীনের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি সব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
বগুড়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাজী সাইফুদ্দীন বলেন, ‘দরপত্রে উল্লিখিত সংখ্যার মালপত্রগুলো সংখ্যায় আর ওজনের মালপত্র ওজন করেই নিতে হবে। দরপত্র বাস্তবায়নের জন্য একটি কমিটি রয়েছে, সেই কমিটি মালপত্রের তালিকা করে দিয়েছে। কিন্তু তিনি (সাইলো অধীক্ষক) যদি মালপত্রের আলাদা তালিকা করেন সেটি আমার জানা নেই।’