চট্টগ্রামে ব্যস্ততম একটি মহাসড়কে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু কোনো কাজেই আসছে না। এটি দিয়ে যানবাহন পারাপার তো দূরের কথা, পথচারীও মাড়ায় না। শহরের শেষ সীমানায় চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের নতুনপাড়া এলাকায় সাত মাস আগে সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছে এয়াকুব অ্যান্ড ব্রাদার্স নামে এটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)।
উত্তর চট্টগ্রাম থেকে শহরমুখী যানবাহন চলাচলের সেতু থাকলেও শহর থেকে উত্তর চট্টগ্রামমুখী যানবাহন চলাচল করছে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে। সাত মাস আগে খুলে দেওয়া হলেও নতুন সেই সেতু দিয়ে চলছে না কোনো গাড়ি। গত বছরের জুন মাসে সেতুটি খুলে দেওয়া হয়। প্রতিদিন ২৬ হাজার গাড়ি এই মহাসড়ক দিয়ে চলাচল করে বলে জানিয়েছে সওজ।
সওজ কর্র্তৃপক্ষ জানায়, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার শেষ সীমানায় নতুনপাড়া ব্রিজ নামে পরিচিত ব্রিটিশ আমলে নির্মিত সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় সেটির উভয় পাশে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে দুটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, চট্টগ্রাম সার্কেল। প্রতিটি সেতুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮ মিটার এবং প্রস্থ ৭ দশমিক ৫ মিটার।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পুরনো সেতুর পূর্ব পাশেরটি নির্মাণ সম্পন্ন করে পশ্চিম পাশেরটির শুধু পিলার নির্মাণ করে পালিয়ে যায়। তিন বছর অর্ধনির্মিত অবস্থায় পড়ে থাকার পর ২০২১-২০২২ অর্থবছরে পশ্চিম পাশের অসমাপ্ত সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ করার উদ্যোগ নেয় সওজ।
সওজ, চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা জানান, অসমাপ্ত সেতুটির গার্ডার ও সø্যাব, অ্যাপ্রোচ সড়ক, রেলিং নির্মাণসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করতে ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এয়াকুব অ্যান্ড ব্রাদার্স। কাজ শেষে গত বছরের জুনে সেতুটি গাড়ি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
কিন্তু এলাকাবাসী বলছে, প্রায় ২ কোটি টাকার এই সেতু কোনো কাজে আসছে না। গাড়ি তো দূরের কথা পথচারীও এই সেতু মাড়ায় না। নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর সেতুটিকে ‘স্ট্যান্ড’ বানিয়ে ফেলেছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকরা। এই সেতুর নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার আগে পুরনো সেতুর উত্তর পাশ ঘেঁষে আঞ্চলিক মহাসড়কের কিছু অংশ দখল করে দাঁড়াতেন এসব অটোরিকশার চালকরা।
অটোরিকশা চালক আবদুর রহমান জানান, নির্মাণকাজ শেষের পর থেকেই সেতুটির প্রায় পুরোটা দখলে নিয়ে দিনভর ভাড়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে শুরু করেন তার মতো চালকরা।
প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি কোনো কাজে না আসার বিষয়টি এক প্রকার স্বীকারও করে নিয়েছেন সওজ, চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি নিজে অনেকবার অটোরিকশাগুলো সরিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তারা শুনছে না। আমরা তো পুলিশ না। এ দায়িত্ব এনফোর্সমেন্টের।’
পুরনো জরাজীর্ণ সেতুটির জায়গায় কেন নতুন সেতু নির্মাণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি, আর কেনই বা দুই-দুটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, এসব প্রশ্নের উত্তরে সওজ কর্মকর্তা পিন্টু চাকমা বলেন, ‘পুরনো সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সেটি যান চলাচলের অযোগ্য হয়নি।’
সওজের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য দুই জেলায় প্রতিদিন (২৪ ঘণ্টার ট্রাফিক ভলিয়ম) বিভিন্ন ধরনের ২৬ হাজার যানবাহন চলাচল করে। ব্যস্ততম এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি চললেও পশ্চিম পাশে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন সেতু দিয়ে একটি গাড়িও চলে না।
নতুন সেতু দিয়ে গাড়ি না চলার তিনটি কারণ জানান সওজ, চট্টগ্রাম অফিসের একাধিক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করে সেখানকার উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রথমত মহাসড়ক থেকে অ্যাপ্রোচ সড়ক ধরে নতুন সেতুতে উঠতে গেলে গাড়ি চালকদের বামে অন্তত ৪৫ ডিগ্রি বাঁক নিতে হয়। দ্বিতীয়ত ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়া সেতুটি এখনো গাড়ি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত আছে। তৃতীয়ত সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা নতুন সেতুটিকে অঘোষিত স্ট্যান্ড বানিয়ে ফেলা। এসব কারণে অব্যবহৃতই থাকছে সেতুটি।’
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে এক ঘণ্টা অবস্থান করে দেখা যায়, পশ্চিম পাশের নতুন সেতু দিয়ে চলছে না কোনো যানবাহন। শহর থেকে উত্তর চট্টগ্রামের দিকে চলাচলকারী যানবাহন পুরনো জরাজীর্ণ সেতুর ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। সেতুর ওপর যাত্রীর জন্য দাঁড়ানোর কারণ জানতে চাইলে অটোরিকশা চালক আহমদ আলীকে বলেন, ‘কোটি কোটি টাকার সেতু হলে কী হবে? গাড়ি তো চলে না, এজন্য দাঁড়িয়েছি।’
শুধু আহমদ নন, নতুন সেতুটির ওপর একইভাবে আরও অনেক অটোরিকশার চালকদের যাত্রীর জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন এই প্রতিবেদক।