গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে বহিরাগত এক গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে এক শিক্ষার্থী ও এক বহিরাগতের বিরুদ্ধে। পরের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের জরুরি সভায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) আবাসিক হলগুলো থেকে ছাত্রত্ব শেষ হওয়া শিক্ষার্থীদের (অছাত্র) হল ত্যাগ করা, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ না করা, ক্যাম্পাস থেকে ভ্রাম্যমাণ দোকান সরিয়ে দেওয়া ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনুমোদনহীন অটোরিকসা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু দুই সপ্তাহে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
হল প্রাধ্যক্ষ ও উপাচার্যের কার্যালয়ের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত ৪ ফেব্রুয়ারির পর থেকে এ পর্যন্ত মওলানা ভাসানী হল থেকে ৫৬ জন, মীর মশাররফ হোসেন হল থেকে প্রায় ১৫০ জন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল থেকে ৮০-৯০ জন, শহীদ রফিক-জব্বার হল থেকে ২০০ জন, আল বেরুনী থেকে আটজন, শহীদ সালাম-বরকত হল থেকে ৩৫-৪৫ জন, কামালউদ্দিন হল থেকে ৪০-৫০ জন, শেখ রাসেল হল থেকে ২৫-৩৫ জন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল থেকে ৪০-৫০ জন শিক্ষার্থীকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
হল প্রাধ্যক্ষদের ভাষ্যমতে, হলগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়। অনেকে বাইরে বাসা ভাড়া পায়নি বলে দুই-তিন দিন সময় নিয়েছে। যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না তাদের কক্ষে তালা দিয়ে সেখানে অন্য ছাত্রদের বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। হলগুলোতে মূলত ৪৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী বেশি। ৪৬ ব্যাচের দুই-তিনটি বিভাগ বাদে বাকিদের ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে। ৪৭ ব্যাচেরও কয়েকটি বিভাগের স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) পরীক্ষা শেষ হয়েছে। প্রশাসন চেষ্টা করছে ৪১ ব্যাচ থেকে ৪৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের বের করার জন্য।
তবে অনেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, হল প্রশাসন অনেক হলের রাজনৈতিক ব্লকে থাকা অছাত্রদের বের করার জন্য অভিযান চালায়নি। যারা বের হয়েছে তাদের অধিকাংশই সাধারণ শিক্ষার্থী ও চাকরির প্রস্তুতির জন্য হলে অবস্থান করতেন।
বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, মওলানা ভাসানী হল, শহীদ সালাম-বরকত হল, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল ও শহীদ রফিক-জব্বার হল থেলে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ও ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে এমন শিক্ষার্থীদের কাউকে নামাতে পারেনি প্রশাসন। ছেলেদের আবাসিক হলগুলোতে এখনো প্রায় পাঁচ শতাধিক অছাত্র অবস্থান করছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত প্রবেশ না করা, ক্যাম্পাসের ভেতরে ভ্রাম্যমাণ দোকান ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনুমোদনহীন অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হলেও তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। এখনো ক্যাম্পাসের ভেতরে অনুমোদনহীন অটোরিকশা চলাচল করে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ বেপরোয়া এসব অটোরিকশার ফলে বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনা ঘটে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি মুরাদ চত্বর সংলগ্ন যাত্রী ছাউনির সামনে বিপরীত দিক থেকে আসা দুটি অটোরিকশার সংঘর্ষ হয়। এতে নতুন প্রশাসনিক ভবনের এক কর্মচারী হাতে আঘাতপ্রাপ্ত হন। পরে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই দুটি রিকশার মধ্যে একটি অটোরিকশা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত না হওয়ায় রিকশাসহ চালককে নিরাপত্তা শাখায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে যেমন, ক্যাফেটেরিয়ার সামনে, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের পাশে ও বটতলায় খাবারসহ বিভিন্ন ধরনের ভ্রাম্যমাণ দোকান বসে।
বহিরাগতের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলেও নিষেধাজ্ঞা জারির ১ সপ্তাহ পর থেকেই নিয়ম ভেঙে বহিরাগত প্রবেশ বেড়ে গেছে। সরেজমিনে ঘুরে ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সরস্বতী পূজা ও ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে বহিরাগতরা ভিড় জমায় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে। এ ছাড়া ১৬ ও ১৭ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা ও শহীদ মিনারসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলে বহিরাগতদের ভিড় জমাতে দেখা যায়।
ভ্রাম্যমাণ দোকান বসার বিষয়ে জানতে চাইলে এস্টেট শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার আব্দুর রহমান বলেন, ‘নিরাপত্তা শাখাকে বলে দিয়েছি কোথাও যাতে ভ্রাম্যমাণ দোকান না বসে। আমরা বিষয়টি দেখছি। যদি ক্যাম্পাসের কোথাও ভ্রাম্যমাণ দোকান বসে থাকে তাহলে তা সরানোর ব্যবস্থা করব।’
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার প্রধান কর্মকর্তা সুদীপ্ত শাহিন বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা অনেক সময় অনুরোধ করে বহিরাগতদের ও অনুমোদনহীন রিকশা ক্যাম্পাসে ঢোকায়। অনেক সময় জোর করেও ঢোকায়। শিক্ষকদের আত্মীয়ের পরিচয়েও অনেক বহিরাগত ঢোকে। তবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য।’
অছাত্রদের হল থেকে অপসারণের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলম বলেন, ‘ এত কম সময়ে হল প্রশাসন যেভাবে কাজ করেছে তাতে আমি সন্তুষ্ট। আমি অত্যন্ত খুশি। হলে অছাত্র যারাই থাকুক তাদের একে একে বের করা হবে। সেই বিষয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে গৃহবধূকে গণধর্ষণের পর গত ৪ ফেব্রুয়ারি উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জরুরি সিন্ডিকেট সভা হয়। সভা শেষে রেজিস্ট্রার আবু হাসান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ৫ কর্মদিবস অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আবাসিক হলে অবৈধ অবস্থানরত পোষ্যকোটায় ভর্তিকৃত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব শেষ হওয়া শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগ করতে হবে অন্যথায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলো, ভাসমান দোকানগুলো সরিয়ে দেওয়ার জন্য নিরাপত্তা ও এস্টেট শাখাকে নির্দেশ দেওয়া হলো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুমোদনহীন অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করা হলো।