১৯৭২ সালে ৩২টা বইয়ের স্টল দিয়ে শুরু হওয়া বইমেলা কি শুধুই বই বিক্রির? বইমেলার মাঠে মিলেছে কত প্রাণ, কত আড্ডা। সেই মিলনমেলা এই বইবসন্তে আজও অটুট। বই কেনাবেচার বাইরেও এবারের মেলায় আলোচনা সভা, সাহিত্য আড্ডা, সৃজনশীল ও সেবামূলক কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো।
বইমেলায় পাঠক যায় বই কিনতে, কিনতে না পারলেও স্টলের সামনে পাতা উল্টিয়ে দেখেন। প্রকাশক আসেন বই বিক্রির খবর নিতে, লেখক আসেন অটোগ্রাফ দিতে, দর্শনার্থীরা ঘুরতে... কেউ ঘুরতে এসে বই কেনেন, আবার কেউ বই কিনতে এসে পুরনো বন্ধুর দেখা পেয়ে ঘুরে চলে যান। কিন্তু এর বাইরেও বইমেলার ভেতর অন্যরকম এক মেলা আছে। কী রকম?
এক কোণে চিত্রশিল্পীরা বসে বসে মানুষের মুখের ছবি আঁকছেন। অন্য কোণে চলছে আড্ডা হই-হুল্লোড়। বইবসন্তে নগরক্লান্ত মানুষের হাঁফ ছাড়া একটু শান্তির জায়গাও বইমেলা।
শুধু তাই নয়, মেলা কেন্দ্র করে বাইরে চলছে সেবামূলক নানা কার্যক্রম। মেলায় আগতদের সুবিধার্থে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। বিনামূল্যে রক্তদান কর্মসূচি, শারীরিক প্রতিবন্ধীদের বিনামূল্যে হুইলচেয়ার সেবা দেওয়াসহ ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টারও করা হয়েছে। সেবামূলক এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠন। স্বেচ্ছাসেবক, পুলিশ আনসারসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা এসব কার্যক্রমে সহযোগিতা করছেন।
মেলা প্রাঙ্গণে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করেছে ঢাকা ওয়াসা। প্রায় প্রতিটি প্রবেশদ্বারের পাশেই রয়েছে পানির বুথ। ‘রক্তে মোরা বাঁধন গড়ি, রক্ত দেব জীবন ভরি’ সেøাগানে বইমেলায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি চলছে। এ ছাড়া স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রম ‘কোয়ান্টাম’ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সন্ধানী’ এবং ঢাবির ম্যানেজমেন্ট নেট-এর উদ্যোগেও বইমেলায় স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি চলছে। শারীরিক প্রতিবন্ধী ও হেঁটে চলাফেরায় অক্ষমদের বিনামূল্যে হুইলচেয়ারে মেলা ঘুরে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে ‘সুইচ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংগঠন। বইমেলায় আসা যেসব মায়ের কোলে ছোট্ট শিশু থাকে তাদের জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উদ্যোগে ‘ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার’ চালু করা হয়েছে। পাঠক দর্শনার্থীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছে ঢাকা সিভিল সার্জন কার্যালয়। এ ছাড়া ডেটলের উদ্যোগে মেলায় বিনামূল্যে সাবান দিয়ে হাত ধৌত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সেবা, ব্যবসা, কর্মসংস্থান সব মিলে বইমেলাকে অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে তা বলাইবাহুল্য। জীবনের সঙ্গে একেবারে মিলেমিশে আছে বলেই এ মেলা বাঙালির হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে। তাই সাহিত্যের রূপ, রস কিছুটা মলিন হলেও এই মেলার আবেদন কমছেই না, বরং বাড়ছে বলে মনে করেন সাহিত্যপ্রেমীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান এবং লেখক মুমিত আল রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাণের এই মেলায় সব প্রাণের সঞ্চার ঘটে। মেলায় এলে মনে হবে না এটি শুধু বইমেলা, মনে হয় যেন এটি মহা মিলনমেলা। বাঙালির চেতনা ও গৌরবের এই মেলা আরও প্রাণবন্ত হোক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক নাহার কবির বলেন, ‘বাঙালির জীবনে ফেব্রুয়ারি শুধু একটি মাস নয়, বরং ফেব্রুয়ারি হলো ইতিহাস, উৎসব, রঙ, ঋতুবৈচিত্র্যের এক মহাসম্মিলন। এ মাসেই ডানা মেলে একুশে বইমেলা! এ যেন আমাদের আত্মার মেলা। এটি বাঙালির জীবনে শুধু উৎসব নয়, মনে হয় একটি সামাজিক মিলনমেলা। প্রকৃত অর্থে একুশে ফেব্রুয়ারি যেমন বাঙালির মননে রক্তে মিশে আছে, তেমনি একুশে বইমেলাও বাঙালির সংস্কৃতিতে জুড়ে আছে। নিঃসংকোচে বলা যায় অমর একুশে বইমেলা আমাদের একটি সাংস্কৃতিক উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়ে গেছে।
গতকাল সোমবার ছিল অমর একুশে বইমেলার ১৯তম দিন। মেলা শুরু হয় বিকেল ৩টায় এবং চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। গতকাল নতুন বই এসেছে ১১৫টি। বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণ : হাসান আজিজুল হক শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোজাফ্ফর হোসেন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ফারুক মঈনউদ্দীন এবং মহীবুল আজিজ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্পের বরপুত্র হাসান আজিজুল হক গল্প-উপন্যাস ছাড়াও গভীর পর্যালোচনা ও প্রজ্ঞাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তার সাহিত্যের অনালোচিত দিকগুলোর ওপর আলোকপাত করার মাধ্যমে আমরা নিজেদের আরও সমৃদ্ধ করতে পারব।’
আজকের সময়সূচি : আজ মঙ্গলবার অমর একুশে বইমেলার ২০তম দিন। মেলা শুরু হবে বিকেল ৩টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।
আলোচনা অনুষ্ঠান : বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্মরণ : জামাল নজরুল ইসলাম শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আসিফ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন সুব্রত বড়–য়া এবং আরশাদ মোমেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক আবদুল মান্নান।