১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই সংকটকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে, তার মধ্যে চলতি গাজা যুদ্ধ সবচেয়ে প্রাণঘাতী। গত বছর ৭ অক্টোবরের পর থেকে শুরু হওয়া এই লড়াইয়ে ইসরায়েলি আগ্রাসনে ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে ২৯ হাজারের বেশি যা এখন ৩০ হাজার স্পর্শের দ্বারপ্রান্তে। শুধু প্রাণহানির বিষয় নয়; বরং বাস্তুচ্যুতি, নারী-শিশুদের ওপর আক্রমণ এবং হাসপাতাল-আশ্রয়কেন্দ্রে হামলা কিংবা মানবিক বিবেচনায় যুদ্ধের আওতা-বহির্ভূত ক্ষেত্রগুলোতে ইসরায়েল যেভাবে হামলা চালাচ্ছে, তা কার্যত নজিরবিহীন।
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজা উপত্যকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উপত্যকায় গত ৭ অক্টোবরের পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী ২৯ হাজার ৯২ জনকে হত্যা করেছে যার মধ্যে বেশিরভাগই বেসামরিক নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন ৬৯ হাজার ২৮ জনের মতো। যুদ্ধ থামার যেহেতু কোনো নজির দেখা যাচ্ছে না, তাই বলা যায়, মৃত্যুসংখ্যা এখন ৩০ হাজার স্পর্শ করার পথে। ইসরায়েলি বাহিনী এই ‘লজ্জাজনক, বীভৎস ও নারকীয়’ মাইলফলক আগামী কয়েক দিনেই মধ্যেই ছুঁয়ে ফেলবে।
গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আলজেরিয়ার একটি প্রস্তাব ওঠার কথা যেখানে গাজায় যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ থাকার দাবি রয়েছে। ‘ভেটো (আমি এটা মানি না)’ ক্ষমতা প্রয়োগ করে সেই প্রস্তাব ভেস্তে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা গাজায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির পক্ষে। নিরাপত্তা পরিষদে উপস্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এ সংক্রান্ত খসড়া প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে। এতে রাফাহ শহরে ইসরায়েলি স্থল অভিযানের বিরোধিতা করা হয়েছে।
এর মধ্যে গত সোমবার জাতিসংঘের একদল বিশেষজ্ঞ চাঞ্চল্যকর দাবি উপস্থাপন করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনি নারীদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে যার ‘বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ’ পাওয়া গেছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেন, ইসরায়েলি সেনারা ফিলিস্তিনি নারী ও কিশোরীদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার করছে, দন্ডাদেশ দিয়েছে, ধষর্ণ করছে এবং যৌন হয়রানি করছে ও হয়রানির হুমকি দিয়ে যাচ্ছে যা ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন এবং রোম সনদ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন মোতাবেক এসব ভয়াবহ অপরাধ শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’
এসব বিশেষজ্ঞের মধ্যে রয়েছেন নারী ও কন্যাশিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাবিরোধী বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার রিম আলসালিম এবং ফিলিস্তিন অঞ্চলে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করা বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ফ্রান্সেকা আবানিজি।
বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন, ফিলিস্তিনি নারী বন্দিদের ইসরায়েলি পুরুষ কর্মকর্তা দ্বারা উলঙ্গ করে তল্লাশি করা হয়েছে। কমপক্ষে দুজন ফিলিস্তিনি নারী বন্দি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। বন্দিদের অনেককে যৌন হয়রানির হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং নানা ধরনের যৌন সহিংসতার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে জাতিসংঘ শিশু তহবিল ‘ইউনিসেফ’-এর মানবিক কর্মকা-ের উপপ্রধান টেড চাইবান বলেন, ‘গাজা উপত্যকায় শিশু মৃত্যুর অসহনীয় মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।’
ইউনিসেফ বলছে, শিশুদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যের জন্য জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর যৌথ মূল্যায়ন অনুসারে গাজার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর অন্তত ৯০ শতাংশ এক বা একাধিক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত। এই মূল্যায়নের দুই সপ্তাহ আগে ৭০ শতাংশের ডায়রিয়া রেকর্ড করা হয়েছিল, যা ২০২২-এর তুলনায় ২৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।