বইমেলার উচ্ছ্বাস প্রাপ্তি শূন্য

ব্যক্তিগত কথাবার্তা দিয়ে শুরু করি। নব্বই দশকে দেশের একটি প্রধান দৈনিকের সাহিত্য-সাময়িকী বিভাগে কাজ করতাম। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন লিখতাম। পুরো মাসজুড়ে আয়োজন করতাম বইমেলা, নতুন বই, লেখক-প্রকাশক, পরিবেশ নিয়ে নানান আয়োজন। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতো ঢাকা বইমেলা। কলেবর ছোট হলেও বই সংক্রান্ত মেলা হওয়ায় নিজে উদ্যোগ নিয়ে কাভার স্টোরি করেছি বহুবার। বিটিভির গ্রন্থ বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলাম বলে সেখানেও বইমেলা, বই ও লেখক-প্রকাশকদের নিয়ে নিয়মিত অনুষ্ঠান আয়োজনের সঙ্গে সক্রিয় জড়িত ছিলাম। উদ্দেশ্য একটাই, আমাদের এই গ্রন্থবিমুখ সমাজে গ্রন্থ কিছুটা হলেও জায়গা খুঁজে পাক, পাঠের অভ্যাস গড়ে উঠুক নতুন প্রজন্মের মধ্যে, লেখকরা লেখার মাধ্যমে জীবিকার কিছু অংশ নির্বাহ করুক, প্রকাশনা একটি শিল্পের আকার পাক। মনে আছে, এই লক্ষ্য পূরণের আশায় অনেক ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লিখতাম। অনেক অতিরঞ্জন করতাম। যা ঘটেনি তাও ঘটেছে বলে লিখতাম বা যাদের এসাইন করতাম তাদেরও বলে দিতাম, এমনভাবে লিখতে হবে যেন সাধারণ মানুষ বই ও বইমেলার প্রেমে পড়ে যায়। তখন নিয়মিত বইমেলায় যেতাম। খোঁজখবর নিতাম। একটি বারোয়ারি মেলার ধরন থেকে বইমেলাকে কীভাবে আলাদা করা যায়, শুধুমাত্র বইকে কেন্দ্র করে কীভাবে একটি মেলা গড়ে তোলা যায় এসব নিয়ে বিস্তর ভেবেছি ও লিখেছি। আশা ছিল একটাই, একদিন বইমেলা হবে সত্যি সত্যি বইমেলা।

গত প্রায় ২০/২২ বছর বইমেলায় যাই না। এই না যাওয়ার পেছনে আমার প্রবাসজীবন দায়ী। ঠিক ফেব্রুয়ারি মাসটায় আমার কখনো দেশে থাকা হয়নি। তবে ইউরোপের কিছু কিছু বইমেলায় ঢুঁ দেওয়ার সুযোগ হয়েছে। সেসব ভিন্ন অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের বইমেলার তুল্যমূল্য বিচার না করাই শ্রেয়। করলে, আমাদের বইমেলা যে প্রকৃত অর্থে বইমেলা না তা প্রতিভাত হয়ে যাবে। এই প্রথম আমি ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে অবস্থান করছি অথচ আমার সেই ২০/৩০ বছর আগের প্রিয় গন্তব্যস্থলে একবারও যাইনি। যাওয়ার আগ্রহ পাচ্ছি না। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, শুধু আমি নই, আরও অনেকেই আগ্রহ হারিয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে, প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক থাকায় সাধারণ পাঠক বইমেলার প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে।

আমাদের যাবতীয় বাঙালিয়ানা, চেতনা, প্রাণ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দায় হঠাৎ করেই বইয়ের ঘাড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র বইকে ঘিরে যে মেলা হতে পারত সেখানে আরও নানান অনুষঙ্গ যুক্ত করে বইকে তার নিজের ঘরেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে রাখা হয়েছে। বই পাঠে উৎসাহের চেয়ে বর্ণমালা প্রেমই যেখানে মুখ্য, একটি ভালো বইয়ের চেয়ে একটি দলবাজি মার্কা বই-ই যেখানে প্রণিধানযোগ্য, ভিন্নমতের লেখক ও প্রকাশকদের যখন মেলায় নিষিদ্ধ করা হয় তখন বইমেলা আর বইমেলা থাকে না। হয়ে যায় ক্ষমতাধরদেরই একটি সাংস্কৃতিক শাখা। শাসক দলের কিংবা আরও ব্যাপকভাবে যদি বলি, আমাদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, চেতনা কেন বইমেলার ঘাড়ে চেপে বসবে? কেন আবাসন মেলার ক্ষেত্রে নয়? কিংবা বাণিজ্য মেলা, পোশাক মেলা, প্রযুক্তি মেলা, কৃষি মেলার ক্ষেত্রে এসব দায় চাপিয়ে দেওয়া হয় না? বই থেকে যখন মুখ্য হয়ে ওঠে অন্য প্রসঙ্গ, অন্য আবেগ, অন্য অহং তখন বইমেলা চরিত্র হারায়। বইমেলায় সবাই ঘুরতে যায়, বই কিনতে খুব কমই মানুষ যায়। যে কারণে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, বিশাল জায়গাজুড়ে, এবং মাসব্যাপী আয়োজিত এই বিশাল মেলায় বই বিক্রির পরিমাণ একশো কোটি টাকারও কম। অথচ নতুন বই নাকি বের হয় পাঁচ সহস্রাধিক। পুরনো বই তো রয়েছেই। প্রকাশকও ছয়শোর বেশি অংশ নেয় বইমেলায়। প্রকাশক হয়ে স্টল পাওয়ার জন্য একটি ট্রেড লাইসেন্সই যথেষ্ট। এই এত এত প্রকাশকের ভিড়ে মানের প্রকাশক ক’জন? কয়টি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মনোনয়ন বোর্ড রয়েছে? সম্পাদনা করার কমিটি রয়েছে? আসল-নকল বিচার করার মতো দক্ষ লোকবল রয়েছে? কারোরই নেই। লেখক যা সাপ্লাই করে তা-ই বই আকারে বের হয়। ভুলভাল ছাপা, তথ্যে বিভ্রাট, গুগল অনুবাদিত, বাক্যবিন্যাসে ভুল, বানান ভুল, দুর্বল ভাষা, ভুল ছন্দের কবিতা ও কবিতা নামে অখাদ্য একত্র করে বই ছাপিয়ে বিক্রির কসরত চলে। কেউ দেখার নেই। এসব ছাপাতে লেখকরাই আবার প্রকাশকদের টাকা দেয়। শুধু তা-ই নয়, যে শ’তিনেক বই ছাপা হয় তার সিংহভাগই নাকি লেখক নিজে কিনে নেয়! আর বইমেলায় গিয়ে কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের বই ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞাপন করে। অর্থাৎ একজন লেখকই সব দায় নিয়ে নেন। সিংহভাগ লেখকের এই অলেখকসুলভ আচরণ ও খ্যাতি পাওয়ার বাসনাকে পুঁজি করে টাকা বানান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রকাশক। আর পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছে স্বয়ং বাংলা একাডেমি। প্রকৃত গ্রন্থপ্রেমী, যারা বই কিনতে বইমেলায় আসেন তারা এসব আজেবাজে, অসম্পাদিত ও মানহীন বই কিনে বিভ্রান্ত হন। শিশু-কিশোরদের মনোজগৎ বিকাশের জন্য কিংবা শিক্ষামূলক বই নেই বললেই চলে।

অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে বাঙালি

সংস্কৃতির জাগরণ ও রুচি নির্মাণের উৎসবে রূপ নিয়েছে বলে বলা হয়। এই তার নমুনা? বইমেলাকে বইমেলার জায়গায় রাখা জরুরি। না হলে, এখন পর্যন্ত যা প্রতীয়মান, বইমেলা পাঠক বাড়ায় না, বাড়ায় ঘুরতে আসা ফুচকা খেতে আসা মানুষ। এরা বই কেনেন না, পড়েন তো না-ই। তারা বইমেলায় আসেন আনন্দ করতে। আনন্দ দেখতে। বইমেলা দখলে নিয়েছেন ভাইরাল মানুষজন কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার সেলেব্রিটিরা। বইমেলা মানে মুশতাক-তিশা, বইমেলা মানে টিপু সুলতান, ডাক্তার সাবরিনা, হিরো আলম, জায়েদ খান। সংবাদ এগুলোই। একটা ভালো বই বা লেখক ভাইরাল হননি। আলোচনায় আসেননি। এ কেমন বইমেলা?

নতুন করে তাই ভাবার সময় হয়েছে। বইমেলা নিয়ে আমাদের প্রাপ্তি, যদি শুধু বইয়ের স্বার্থ ভাবি, প্রায় শূন্য। পেশাদারি মনোভাব নিয়ে আয়োজন করতে হবে বইমেলা যেখানে লেখক ও প্রকাশক লাভবান হবেন আর উপকৃত হবেন গ্রন্থপ্রিয় মানুষ। ঠিক পশ্চিমে যেমনটা হয়। সেখানে বইমেলার সঙ্গে কোনো আবেগ যুক্ত করে দেওয়া হয় না। প্রকাশনা একটি শিল্প। প্রকাশকরা বই বিক্রি করে ব্যবসা করবেন। লেখকরা রয়্যালিটির বিনিময়ে প্রকাশকদের জন্য বই লিখবেন। তারা তাদের পরিশ্রমের মূল্য পাবেন। আপনি ভালো লেখক হলে এমনিতেই খ্যাতি পাবেন। না হলে পাবেন না। এই প্রতিযোগিতা না থাকলে ভালো বই যেমন বের হবে না তেমনি লেখকের নামে দুর্বৃত্তরা মেধার বাজারে রাজত্ব করবে ঠিক এখন যেমন করছে আর প্রকৃত লেখকরা এই অনৈতিক দৌড়ে হেরে গিয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বেন। বইমেলার যে উদ্দেশ্য, একটি শিক্ষিত, গ্রন্থপ্রেমী ও পাঠ-আনন্দিত জনগোষ্ঠী তৈরি করা তা কোনোদিনই সম্ভব হবে না।

যে ব্যক্তিগত কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম তার সঙ্গে একটু সংযুক্তি দিয়ে শেষ করছি। আসলে এই সংযুক্তিটুকুর জন্যই শুরুতে ওই ব্যক্তিগত কথাগুলো বলা। যখন ওই স্বনামধন্য দৈনিকটির সাহিত্যে কাজ করতাম, তখন বহু প্রকাশক আমার বই প্রকাশের আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। পান্ডুলিপির জন্য চাপাচাপি-অনুরোধ করতেন।  বইমেলায় গেলে আলগা খাতির পেতাম। ঠিকই বুঝতাম, আমার বই প্রকাশের আগ্রহের পেছনে একটি কৃতজ্ঞতাবোধ ও বিনিময় তত্ত্ব কাজ করছে। কখনো রাজি হইনি। যে অল্প কয়েকটি বই প্রকাশ হয়েছে, তা বইমেলাকেন্দ্রিক নয়। এমনকি মেলায় যে প্রকাশনী তাদের স্টলে আমার বই রাখত, আমি সযত্নে সেসব প্রকাশনী এড়িয়ে যেতাম।

আমিও একবার ফেসবুকে লিখেছিলাম বই বের করতে চাই। বেশ কয়েকজন নক করেছিলেন। কিন্তু মাত্র ৩/৪ জন প্রফেশনালি কথা বলেছিলেন। বাকিদের কারও দাবি ছিল ২০০ বই কেনার, কারও বা ছাপার কাগজ কিনে দেওয়ার, কারও বা নগদ টাকার। এক প্রকাশক কবিতাসমগ্র বের করার পাশাপাশি একটি পুরস্কার দেওয়ারও অফার দিয়েছিলেন। বিনিময়ে ক্রেস্ট নির্মাণ ও অন্যবিধ খরচের জন্য কিছু সহযোগিতা চেয়েছিলেন। আমি ভাবি, আমি যখন প্রয়োজনীয় ছিলাম, টুকটাক ক্ষমতা ছিল তখন এ ধরনের অফার করতে কেউ সাহস পেত কি? বইমেলার অধিকাংশ বই কীভাবে বের হচ্ছে, তার ধারণা দিতেই এই ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের উল্লেখ। এই যখন একটি মেলার চিত্র, এই যখন আমাদের কথিত চেতনা ও সংস্কৃতির নামে আয়োজিত উৎসবের মর্মকথা তখন বইমেলার অর্জন ও প্রাপ্তি নিয়ে ইতিবাচক কিছু ভাববার অবকাশ কোথায়? উচ্ছ্বাস আর প্রাপ্তি দুটি দুই জিনিস। বইমেলা নিয়ে আমাদের অনেক উচ্ছ্বাস, কিন্তু প্রাপ্তিতে ভরাডুবি।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক, স্টকহোম, সুইডেন

shakil.reaz@gmail.com