‘পাঠক’ কমছে বাড়ছে ‘দর্শক’

তাত্ত্বিক, সমালোচক, অ্যাকাডেমিক, দ্বিভাষিক লেখক, কবি ও অনুবাদক আজফার হোসেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে গ্র্যান্ড ভ্যালি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ইন্টারডিসিপ্লিনারি স্টাডিজ-এ অধ্যাপনা করছেন। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় লেখালেখি করেন। ভাষা, সাহিত্য, সাহিত্যতত্ত্ব, সংস্কৃতি, দর্শন, ইতিহাস, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং রাজনীতি-সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি প্রায় ৪০০ প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লিখেছেন যেগুলো বিভিন্ন সময় দেশ-বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে। বেশ কয়েকটি ভাষা থেকে তার ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে। বাংলা ও ইংরেজিতে তার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। যেমন প্রকাশিত হয়েছে তার বেশ কিছু ব্যঙ্গরচনা এবং ট্র্যাভেলগ। বাংলাদেশে থাকাকালে তিনি প্রচুর কলাম লিখেছেন এবং একাধিক পত্রিকার সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন। কথা বলেছেন তাপস রায়হান

এবারের বইমেলায় আপনার কয়টি বই এসেছে?

আজফার হোসেন : মেলায় একটি বই এসে গেছে; আরেকটি আসি-আসি করছে। প্রথম বইটির নাম চিহ্ন ভাসে অবশেষে; বইটি বের করেছে পুণ্ড্র প্রকাশন। আর দ্বিতীয় বইটির নাম সাম্রাজ্যবাদ ও সাংস্কৃতিক রাজনীতি। প্রকাশ করেছে সংহতি।

আপনার বই পাঠককে কেন পড়তে বলবেন?

আজফার হোসেন : চিহ্ন ভাসে অবশেষে একটি নিরীক্ষামূলক ভ্রমণাখ্যান। আর বইটা পাঠককে পড়তে বলব এই কারণে যে, এটি সনাতন ভ্রমণকাহিনি নয় মোটেই; এতে অবশ্যই দেহ ও মনের সময়-ও-স্পেস-ভাঙা ভ্রমণের গল্প আছে; কিন্তু ঘটেছে আরও বিষয়। অর্থাৎ বইটি গ্রহণ করেছে এমন এক মিশ্র ফর্ম, যার ফলে একজন পাঠক অনায়াসে সাহিত্যের বিভিন্ন এলাকার কবিতা, গল্প, উপন্যাস, সমালোচনা, নাটক ইত্যাদির স্বাদ নিতে পারে অনায়াসেই। এমনকি এতে আছে লঘু চালে তত্ত্বালোচনা ও রম্যগল্প। আর দ্বিতীয় বই সাম্রাজ্যবাদ ও সাংস্কৃতিক রাজনীতি পড়তে বলব এই কারণে যে, বইটিতে পাওয়া যাবে সময়, সমাজ, সাহিত্য,সংস্কৃতি, সম্পর্ক, পরিবেশ, রাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে এমন কিছু আলোচনা, যেগুলো দেশ ও দুনিয়ার মানুষের মুক্তির স্বার্থেই নতুন রাজনীতির পথ অন্বেষণ করে এবং সে-কারণেই চিন্তার সৃজনশীলতাকে দারুণ গুরুত্ব দেয়।

বই পৌঁছানোর জন্য কোন ধরনের কৌশল অবলম্বন করেন?

আজফার হোসেন : স্বীকার করি, কারিগরি অর্থে বই পৌঁছানোর রীতিনীতি বা কৌশলে নিজেকে মোটেই পারদর্শী মনে করি না। তারপরও পৌঁছানোর যে তাগিদ বোধ করি না, তা নয়। সেই কারণে মাঝেমাঝে সামাজিক মাধ্যমে নিজের বইয়ের খবর পোস্ট করি। আর বাদবাকি কৌশলের জন্য প্রায় একচেটিয়াভাবেই বইয়ের প্রকাশকের ওপর নির্ভর করি।

আমাদের বই প্রকাশ-প্রচার-আলোচনা ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

আজফার হোসেন : হ্যাঁ, তা ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক তো বটেই। তা হওয়ার কারণও আছে। শিক্ষিত বাংলাদেশি মধ্যবিত্তের একটা বড় অংশ আজকাল বই পড়াকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে না করায় বইয়ের প্রকাশ-প্রচার-আলোচনা সার্বক্ষণিক অনুশীলন ও অঙ্গীকারের বিষয় না হয়ে তা আনুষ্ঠানিকতায় রূপান্তরিত হয়েছে।

কেউ বলে বইয়ের পাঠক কমছে, আবার কেউ বলে বাড়ছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

আজফার হোসেন : কথাটা অদ্ভুত শোনালেও সত্য যে, বইয়ের ‘পাঠক’ কমছে কিন্তু বইয়ের ‘দর্শক’ বাড়ছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের অধিকাংশই বই পড়ার চেয়ে বই ‘দেখে’ বেশি, এমনকি পড়ার চেয়ে কেনে বেশি। মাঝেমাঝে এও মনে হয়, তারা বই যতটা না দেখে, বই-ই তাদের উল্টা দেখে বেশি। এই ডিজিটাল ক্যাপিটালিজমের যুগে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের অভ্যাসটাই তৈরি হয়েছে এমনভাবে যে, একজন যতটা না অনলাইনে কোনো ছোট লেখা বা আর্টিকেল পড়ে, তার চেয়ে অনেক কম পড়ে বই। আবার অন্যদিকে ইলেকট্রনিক বই বা কিন্ডল এডিশনকেই বেশি পছন্দ করে তরুণদের বড় অংশ। আসলে ওই ডিজিটাল ক্যাপিটালিজমই তৈরি করেছে এমন এক ‘ইনস্ট্যান্ট কফি অ্যাপ্রোচ’-এর সংস্কৃতি, যেখানে একটা আস্ত বই হাতে নিয়ে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে পড়ার বিষয়টা সাধারণত কাক্সিক্ষত নয়।

বইমেলার আয়োজন ও পুরস্কার নিয়ে বাংলা একাডেমির ভূমিকা কেমন দেখছেন? কেমন হতে পারে?

আজফার হোসেন : বিদেশ বিভুঁইয়ে থাকি বলে আমার দেখায় অবশ্যই যে একটা দূরত্ব আছে, তা স্বীকার করি। তবে যতটুকু দেখতে পাই, তাতে মনে হয় যে, আমাদের দেশে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিগন্তের বাইরে আলাদাভাবে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা বাংলা একাডেমি দেখাতে সক্ষম নয়। সেটাই স্বাভাবিক। আর পুরস্কার? অবশ্যই অন্যান্য বিষয়ের মতো পুরস্কারেরও রাজনীতি আছে। আর সারা পৃথিবীতেই যেকোনো পুরস্কার মানেই গ্রহণ ও বর্জনের খেলা এবং তা খানিকটা তামাশাও বটে। আর পুরস্কার পাওয়া মানেই ‘ভালো’ লেখক হয়ে ওঠা নয়। ক্ষমতাসীনদের দালালরা যত সহজে পুরস্কার পেয়ে থাকেন, সেই অনুপাতে যারা সেই রকম নন, তারা কম পুরস্কার পান বা পান না বললেই চলে। তবে মহৎ লেখকদেরও মাঝেমধ্যে পুরস্কৃত হতে দেখেছি। আর বাংলা একাডেমির ভূমিকা কেমন হতে পারে, তা বলতে গেলে অনেক কিছুই বলতে হয়। অল্প পরিসরে, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে এখানে বলা সম্ভব নয়। তবে এতটুকু বলি দেশে যেমন সত্যিকারের গণতন্ত্র দরকার, বাংলা একাডেমিতেও তেমনি সত্যিকারের গণতন্ত্র কাম্য।

বইমেলাকে কীভাবে লেখক-পাঠক ঘনিষ্ঠ করা যায়?

আজফার হোসেন : বইমেলায় বিভিন্ন ধরনের লেখক থাকে যেমন, পাঠকও থাকে তেমন। তাই সহজে ও সংক্ষেপে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া মুশকিল। আবার সব লেখক, একজন পাঠককে ঘনিষ্ঠ করার কথা মাথায় রাখেনও না। তবে এতটুকু বলা যায় সবার উপরে ভাষা সত্য, তাহার উপরে নাই (যদিও আমি উত্তরাধুনিকতাবাদীদের মতো নিছক ভাষাব্রহ্মবাদী নই)। অর্থাৎ জুতসই ভাষা তৈরি করা ছাড়া, পাঠকের কাছে আসা সম্ভব নয়।