বাড়ে ব্যয় সময় বাড়ে কাজ এগোয় না

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণসহ সমন্বিত সুন্দরবন ব্যবস্থাপনায় ১৫৭ কোটি ৮৭ লাখ ৫১ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩ বছরমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বনবিভাগ। তবে মাত্র ২ বছরে এ প্রকল্পে ব্যয় বেড়ে ১৬৭ কোটি টাকায় আর সময় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ বছর। অথচ বাস্তবায়ন কাজে অগ্রগতি মাত্র ১৭ শতাংশ।

বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিষ দিয়ে মাছ শিকার, নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন, বন্যপ্রাণী নিধন, অবাধে গাছ কাটা ও বনের মধ্য দিয়ে ভারী নৌযান চলাচল করায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুন্দরবন। এ ছাড়া প্রাকৃতিক কারণে সুন্দরবনে বেড়েছে পানি ও মাটির লবণাক্ততা। বাড়ছে পলি পড়ার হার ও নদীভাঙন। এতে কমছে বনের প্রধান সম্পদ সুন্দরীগাছ ও ঘন বনের পরিমাণ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সুন্দরবন সুরক্ষায় ১৫৭ কোটি ৮৭ লাখ ৫১ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নেওয়া হয়, যা বাস্তবায়নে মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

সূত্রটি জানায়, তিন বছরমেয়াদি এই প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৪ সাল পর্যন্ত। সেটি আরও ১ বছর বেড়ে ২০২৫ সাল হয়েছে। আগে খরচ ছিল ১৫৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। তা বেড়ে এখন ১৬৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বাস্তবায়ন কাজে অগ্রগতি মাত্র ১৭ শতাংশ।

বৃহত্তর খুলনা সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি সেখ আশরাফ উজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পে এমন করুণদশা অপ্রত্যাশিত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতিই এজন্য দায়ী।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি মানেই ব্যয় বৃদ্ধি। আর বাড়তি এই ব্যয় হওয়া মানে জনগণের টাকার অপচয়। এ ছাড়া দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায়  না। তাই এ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের সহযোগী অধ্যাপক মো. রকিবুল হাসান সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হলে সুফল দেরিতে আসবে। নানাভাবে মানুষকে এর দুর্ভোগ ও ভোগান্তি পোহাতে হবে। এ ছাড়া টাকারও অপচয় হবে। তাই শিগগির প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি।

এ ব্যাপারে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ও প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মিহির কুমার দো বলেন, প্রকল্পের আওতায় এখন ক্যাম্প অফিস ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে। সেই সঙ্গে গবেষণার কাজও চলমান।

কাজে অগ্রগতি কম সম্পর্কে মিহির কুমার দো জানান, পিডি নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় সময় নষ্ট হয়। এ ছাড়া অর্থছাড়েও বিলম্ব হচ্ছে। এসব কারণেই কাজে অগ্রগতি কম।

প্রকল্প অফিস জানায়, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে (খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলা) প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় বনের প্রতিবেশ সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধার, স্থায়িত্ব প্রদান, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, বাঘ-মানুষের বিরোধ হ্রাস এবং বন ও বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বনবিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে। বিদ্যমান অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ সৃষ্টি ও টহল জোরদার হবে। সম্পদের পরিমাণ নিরূপণ, সব বন্যপ্রাণীর সংখ্যা, তাদের আবাস্থল, রোগবালাই ও রক্ষিত এলাকার বৈশিষ্ট্য ও জরিপ, জলজসম্পদের পরিমাণ নিরূপণ করা হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মাটি ও পানির লবণাক্ততা পরীক্ষা-সংক্রান্ত জরিপ কাজ সম্পাদনের মাধ্যমে পরিবীক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সম্পদের টেকসই সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও পারমিট সিস্টেম ও পরিচয়পত্র অটোমেশনের মাধ্যমে সেবা সহজ করা হবে। এ ছাড়া ৩৬১ দশমিক ৪৫ হেক্টর চর বনায়ন, ২২২ দশমিক ২২ হেক্টর প্ল্যান্টিনেশন, ৫০ হেক্টর ব্লক বাগান সৃজনসহ বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ রোপণের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের কাঠের চাহিদা পূরণ ও সবুজ বেষ্টনী তৈরির মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা হবে। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে অন্তত ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে।