কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করবে, তারা সেইসব লোকের সঙ্গে থাকবে, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, অর্থাৎ নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সালেহদের (নেককার) সঙ্গে। কতই না উত্তম সঙ্গী তারা!’ -সুরা নিসা : ৬৯
শহীদ, সিদ্দিক ও সালেহ যারা : সিদ্দিক বলা হয় এমন লোককে, যে নবীর দাওয়াত পাওয়া মাত্র বিনাবাক্যে মেনে নেয়, কোনো রকম গড়িমসি করে না ও কালক্ষেপণ করে না। সালেহ বলা হয় এমন নেককার ব্যক্তিকে, যে অসৎ চিন্তা ও অসৎ কাজ থেকে নিজের দেহ-মনকে পরিশুদ্ধ করে এবং সর্বক্ষেত্রে শরিয়তের অনুসরণ করে চলে।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি নবী কারিম (সা.)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি আমার কাছে আমার প্রাণ ও পরিবারবর্গ অপেক্ষাও বেশি প্রিয়। যখন বাড়িতে থাকি আর আপনার কথা মনে পড়ে, নিজেকে একদম ধরে রাখতে পারি না। ছুটে এসে আপনাকে দেখে তবে শান্ত হই। যখন আমার ও আপনার মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়, তখন চিন্তা করি আপনি তো জান্নাতে প্রবেশ করে নবীদের সঙ্গে উচ্চস্থানে চলে যাবেন। আর আমি যদি জান্নাত লাভ করতে পারি, আশঙ্কা হয় আপনাকে হয়তো দেখতে পাব না (যেহেতু আমার স্থান থাকবে অনেক নিচে)। তারই জবাবে উপরোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।’-তাফসিরে কুরতুবি
আল্লাহর নির্দেশিত পথ সরল পথ : আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তাদের যে বিষয়ে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে, তারা যদি তা পালন করত, তবে তাদের পক্ষে তা বড়ই কল্যাণকর হতো এবং তা (তাদের অন্তরে) অবিচলতা সৃষ্টিতে অত্যন্ত সহায়ক হতো এবং তখন অবশ্যই আমি নিজের পক্ষ থেকে তাদের মহাপ্রতিদান দান করতাম এবং অবশ্যই তাদের সরল পথ পর্যন্ত পৌঁছে দিতাম।’-সুরা নিসা : ৬৮
বর্ণিত আয়াত প্রসঙ্গে তাফসিরে তাওজিহুল কোরআনে বলা হয়েছে, বনি ইসরাইল সস্প্রদায় যদি উপদেশ গ্রহণ করত, তাদের জন্য মহাপ্রতিদান সুনিশ্চিত ছিল এবং সরল পথের দিশাও পেয়ে যেত। আল্লাহর অনুগত্যশীল বান্দারা ওইসব লোকদের সঙ্গে থাকবে যাদের আল্লাহ বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করেছেন। অর্থাৎ নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সালেহিনদের সঙ্গে। তারা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দা। তাদের প্রতিদান দানে আল্লাহই যথেষ্ট।
নবী, অলিদের সাহচর্য লাভ : নবীরা ইলম, আমল ও উত্তম চরিত্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছেন। তারপর সিদ্দিকরা, যারা কথা ও কাজে সততা ও আদর্শে উঁচু মর্যাদার অধিকারী হয়েছেন। অন্তরের পরিশুদ্ধি অর্জনে পূর্ণতায় পৌঁছেছেন। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস লালন করেছেন।
তারপর শহীদদের অবস্থান, যারা একমাত্র আল্লাহর জমিনে আল্লাহর কালেমাকে উঁচু করার উদ্দেশ্যে স্বীয় জীবন তার পথে উৎসর্গ করেছেন।
তারপর সালেহরা, যারা সম্পূর্ণ আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুসারে দুনিয়াতে জীবনযাপন করেছেন। নবী, অলিদের সাহচর্য লাভের উদ্দেশ্য এটা না সবাই একই স্তরে থাকবে, বরং তারতম্য হবে। তবে একজন অন্যজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হবেন। মুমিনরা যখন কোরআন মাজিদে দেখানো পথে আমল করবেন। তখন সত্যিকারের হেদায়েত লাভে ধন্য হবেন। তবেই মিলবে নবী, অলি ও সালেহদের সঙ্গলাভের মতো সৌভাগ্য। আল্লাহপ্রদত্ত পথে চলার নামই ‘সিরাতে মুস্তাকিম।’ আহলে কিতাব সম্প্রদায় তাদের কিতাব অনুসারে চললে তারাও সুপথপ্রাপ্ত হতো।
আল্লাহর রজ্জু সরল পথ : ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা কী করেই-বা কুফর অবলম্বন করবে, যখন তোমাদের সামনে আল্লাহর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হচ্ছে এবং তার রাসুল তোমাদের মধ্যে বর্তমান রয়েছেন? আর (আল্লাহর নীতি এই যে,) যে ব্যক্তি আল্লাহর আশ্রয়কে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরে, তাকে সরল পথ পর্যন্ত দেওয়া হয়।’-সুরা আলে ইমরান : ১০১
আল্লাহর আশ্রয়কে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার অর্থ ‘সিরাতে মুস্তাকিমে’র মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন। আর ‘রাসুলের সুন্নাহ’ আল্লাহর কিতাবেরই ব্যাখ্যা।
যে ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনকে সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে সেই সত্যপথের অভিসারী। ইমান ও একত্ববাদের বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে, সে আল্লাহর পথেই থাকবে। যাদের আল্লাহর পরিচয় লাভের সৌভাগ্য অর্জন হয়েছে, তারা আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার যোগ্যতা অর্জন করে নিয়েছেন। যেটাকে আয়াতে সিরাতে মুস্তাকিম বলা হয়েছে। -রুহুল বয়ান : ৭০
ইবাদত-বন্দেগির ফজিলত : ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। এটাই সরল পথ। তোমরা কেবল তারই ইবাদত করবে।’-সুরা আলে ইমরান : ৫১
আল্লাহর পথ : হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে বান্দার দুটি পা আল্লাহর পথে ধুলায় ধূসরিত হবে, তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না।’-সহিহ বোখারি : ২৮১১
বর্ণিত হাদিসের ব্যাখ্যায় মোল্লা আলি কারি (রহ.) বলেন, ‘প্রতিটি এমন আমল, যার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়।’ অর্থাৎ যে আমলে আল্লাহ খুশি হন, সেটিই আল্লাহর পথ।