চুলের সাজে বসন্তের ফুল

শীত শেষে গুটিগুটি পায়ে বসন্ত এসেই গেছে। প্রকৃতি সেজেছে তার সবচেয়ে সুন্দররূপে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে রঙ ও উজ্জ্বলতার আভা। আর রয়েছে নানান রকমের ফুলের সম্ভার। বসন্তের ফুলেরা ছড়াচ্ছে তাদের মোহনীয় রূপের ছটা। এ সময়ের প্রকৃতির সঙ্গে মিল রেখে সাজসজ্জার উপকরণে যুক্ত করতে পারেন বসন্তের ফুলেদের। যে কোনো অনুষ্ঠানে, বিকেলে বেড়াতে যাওয়ার সময়, বিশ^বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান বা অফিস প্রোগ্রামে যে কোনো সাজের সঙ্গে চুলে বসন্তের ফুল গুঁজে নিমিষেই হয়ে উঠতে পারেন অপরূপা। কী কী ফুল কোন কোন স্টাইলে পরলে সুন্দর লাগবে জানালেন তানজিলা তাহরিন

ফুলের রানী গোলাপ

চুলে ফুলের সাজে গোলাপ আজও অনন্য। লাল, হলুদ বা সাদা গোলাপ ছাড়াও মিষ্টি গোলাপি রঙের গোলাপ চুল সাজাতে বেশি প্রচলিত। খোঁপার সঙ্গে কানের নিচে দুটি গোলাপ গুঁজে চুলের সাজ এখন বেশ সেকেলে। এর বদলে সামনে হালকা বেঁধে পেছেনে চুল ছেড়ে রাখতে পারেন। মাথার পেছনে চুলের বাঁধনের ওপর লম্বালম্বি কিছু গোলাপ সোজা করে গুঁজে দিতে পারেন। এটা বেশ ফেস্টিভ একটা লুক দেয়। কনের সাজে খোঁপা করে পুরো খোঁপা গোলাপে ঢেকে দেওয়াকে ফ্লোরাল বান বলে। এই সাজ কনের বান্ধবী ব্রাইডস মেইডরাও শাড়ি বা লেহেঙ্গার সঙ্গে লাল ছাড়া অন্য রঙের গোলাপ দিয়ে করতে পারেন। এ ছাড়া মাঝখানে বা একপাশে সিঁথি করে চুল একটু পেঁচিয়ে টুইস্ট করে তার শেষ প্রান্তে ক্লিপ দিয়ে আটকে নিতে পারেন গোলাপ কুঁড়ি। ছোট বা কাঁধ অবধি লম্বা চুলে মেসি বান করে ওপরের দিকেও গোলাপ গুঁজে দেওয়া যায়। একটু ভিন্নতা আনতে অনেকে গোলাপ পরেন মুকুটের মতো করে। চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কালহোর ফুল পরার এই স্টাইলটিতে অনুপ্রাণিত হয়ে কনে ছাড়াও অনেকেই আজকাল এভাবে গোলাপ গুঁজছেন চুলে। গাঢ় রঙের পোশাকের সঙ্গে সাদা গোলাপ সাজে আনে মিষ্টতা। এ ছাড়া বিভিন্ন রঙের শেইডেড গোলাপও এখন চুলের সাজে ভীষণ ট্রেন্ডি।

জারবারা ও চন্দ্রমল্লিকা

খোলা চুলে জারবারার রিং বা বেণিতে জারবারা ও পুঁতি দিয়ে মালা করে জড়িয়ে পরেন অনেকেই। গায়ে হলুদের কনে থেকে শুরু করে বসন্তবরণ অনুষ্ঠান সবেতেই জারবারা বেশ পছন্দের। বেশ কয়টি রঙের জারবারা বাজারে পাওয়া যায় তাই পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে বা কন্ট্রাস্ট করে এই ফুল চুলে পরতে অনেকেই ভালোবাসেন। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে হলুদ শাড়ির সঙ্গে খোঁপা বা খোলা চুলে গুঁজে নিতে পারেন হলুদ অথবা ম্যাজেন্টা রঙের মাঝারি আকারের জারবারা। চুলে লুজ কার্ল করে ঝোলাতে পারেন কানের নিচে। আবার এই ফুলের টিকলি করেও পরতে পারেন, সঙ্গে গয়না এবং সাজগোজ থাকবে ছিমছাম। স্নিগ্ধতা ছড়াতে চন্দ্রমল্লিকার জুড়ি নেই। সাদা চন্দ্রমল্লিকার রিং খোলা চুলে বসন্তের প্রথম দিনে হলুদ শাড়ির সঙ্গে ভীষণ সুন্দর ও স্নিগ্ধ লুক দেয়। চুলের সামনে টুইস্ট করে পেছনে একটি ঢিলা বেণি করে গেঁথে নিতে পারেন চন্দ্রমল্লিকা। খোঁপাতেও চন্দ্রমল্লিকা গুঁজে যে কোনো উৎসবে হয়ে উঠতে পারেন অনন্যা।

জিপসি ও ক্যালেন্ডুলা

বর্তমানে যে কোনো ফুলের রিংয়ে ছোট ছোট সাদা জিপসি ফুলের দেখা পাওয়া যায়। চুলে যে কোনো ফুলের সঙ্গে জিপসি গুঁজে নিলেই সাজে আসে বেশ ভিন্ন একটা লুক। আবার শুধু কিছু জিপসি সিঁথির দুই পাশে টুইস্ট করে তার সঙ্গে গুঁজে নিলে দারুণ স্টাইলিশ লুক পাওয়া যায়। ব্রাইডাল শাওয়ারে গাউনের সঙ্গে ভীষণ মানিয়ে যায় জিপসি ও ক্যালেন্ডুলার ক্রাউন। ছোট ছোট বিভিন্ন রঙের ক্যালেন্ডুলা একটু লম্বা বেণিতে ক্লিপ দিয়ে আটকে নিতে পারেন। আবার কার্ল করা খোলা চুলে ববি পিনের সঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়েও এই ফুল পরা যায়। এই লুকটি এখন বেশ জনপ্রিয়। শাড়ি বা লেহেঙ্গার সঙ্গে পারফেক্টভাবে মানিয়ে যায়। চুলের সঙ্গে মিল রেখে হাতেও পরে নিতে পারেন ক্যালেন্ডুলার ব্যান্ড।

বেলিতে স্নিগ্ধতা

স্নিগ্ধতা আর বেল যেন পরস্পরের সমার্থক। যে কোনো অনুষ্ঠানে বা প্রিয়জনের সঙ্গে বেড়াতে বেরোলে খোঁপায় বা হাতে বেলির গাজরা জড়িয়ে নিতে পারেন। নিমেষেই সৌরভে মন ভরে উঠবে। সেই সঙ্গে পাবেন স্নিগ্ধ একটা লুক। শুধু শাড়ি না, যে কোনো পোশাকের সঙ্গেই চুলে বেলির মালা মানানসই। বেণিতেও জড়িয়ে নেওয়া যায় আনাসেই। বেলির পাশাপাশি বেলকুঁড়ির গাজরাও কাছাকাছি লুক দেয়। বড় ফুলের সঙ্গে বেলকুঁড়ি গেঁথে মালার মতো করেও খোলা চুলে রিং করে পরতে পারেন, আবার খোঁপার দুই পাশ দিয়ে ঝুলিয়েও পরা যায় বেলকুঁড়ির গাজরা।

কাঠগোলাপের সাদার মায়ায়

অ্যাস্থেটিক ফুল হিসেবে কাঠগোলাপের জুড়ি নেই। কাঠগোলাপের প্রতি প্রিয়তা প্রকাশ করতে অনেকেই ভালোবেসে চুলে জড়িয়ে নেন এই ফুল। দেশীয় সুতি শাড়ির সঙ্গে খোঁপায় দুটো কাঠগোলাপ অদ্ভুত মায়াময়তার সৃষ্টি করে। সামনের চুল হালকা করে পেছনে অর্ধেক বেঁধে তাতে লাগিয়ে নিতে পারেন চার পাঁচটি কাঠগোলাপ। বাকি চুলগুলো খোলা ছেড়ে দুন বা হালকা কার্ল করে নিন। কাঠগোলাপ খুব নাজুক ফুল হওয়ায় কিছুক্ষণ পর মিইয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সুতোয় গেঁথে মালা করেও জড়িয়ে নিতে পারেন খোঁপায়। সাদার পাশাপাশি গোলাপি কাঠগোলাপেও ভিন্নতা আনতে পারেন সাজে।

নানা ফুলের নানা রূপ

ভালোবেসে চুলে পরতে পারেন যে কোনো ফুলই। শুধু যে প্রচলিত ফুলগুলোয় কেশ সজ্জায় গ্রহণ করা যায় এমনটা নয়। চুলের যে কোনো সাজে উজ্জ্বল রঙের অর্কিড ভীষণ সুন্দর লাগে। বর্তমানে ফুলের দোকানগুলোতে অর্কিড বেশ অ্যাভেলেভেল। কাঠি বা ববি পিনে গুঁজে যে কোনোভাবে খোলা চুলে পরতে পারেন দুটো বা বেশ কিছু অর্কিড। একইভাবে পরতে পারেন বিভিন্ন রঙের গ্লাডিওলাসও। বসন্তের অন্যতম ফুল আগুন রঙা পলাশ। পলাশের কিছু ফুল নিয়ে ক্লিপ বা পিনের সঙ্গে খোঁপায় পরলে অসাধারণ একটি লুক পাবেন। বা কোথাও যদি পান মাধবীলতা বা সোনা রঙের কনকচাঁপা, পরে নিতে পারেন সেগুলোও। চুলে গুঁজে নিতে পারেন চলতি পথে পাওয়া যে কোনো বনফুল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অধিকারী এসব ফুল আপনার সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তুলবে কয়েক গুণ। আর তাই কেশবিন্যাসে ফুলের ব্যবহার বহু যুগ ধরেই চলে আসছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধু বদলেছে ফুল পরার ধরন ও নিত্যনতুন ফুলের গ্রহণযোগ্যতা।

মডেল : ইফা, পুতুল ও রাখি কবীর

সাজ : শোভন মেকওভার

ছবি : আবুল কালাম আজাদ