মাদকে কোটিপতি চেয়ারম্যান

মিয়ানমার থেকে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বছরে শত শত কোটি টাকার মাদক প্রবেশ করে বাংলাদেশে। এসব মাদক আনা ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়া উপজেলাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কারবারিরা। কক্সবাজারের যেসব মাদক কারবারি অবৈধভাবে কোটি টাকার মালিক হয়েছে, এমন ৫৮ জনের একটি তালিকা নিয়ে কাজ শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে তালিকার ১৫ জনের সম্পদের অনুসন্ধান চলছে। এ তালিকায় আছেন টেকনাফের সাবেক ও বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বারসহ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি। এসব কারবারির নামে-বেনামে কী পরিমাণ সম্পদ আছে, ব্যাংকে কী পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত রেখেছেন এবং কী পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন তার বিস্তারিত তুলে ধরে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুদকের কক্সবাজার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রিয়াজউদ্দিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন উপসহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মাসুম ও আসিফ আরাফাত। অনুসন্ধান টিম অভিযুক্তদের তথ্য-উপাত্ত চেয়ে গত বছর ২০ আগস্ট দেশের তফসিলি ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ভূমি অফিস ও রেজিস্ট্রি অফিসসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেয়।

চিঠিতে বলা হয়, কক্সবাজার জেলার টেকনাফের ৫৮ জন মাদক কারবারির বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের একটি অভিযোগ জমা পড়েছে। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে অভিযুক্তদের মধ্যে ১২ জনের নামে-বেনামে কোনো ব্যাংক হিসাব, এফডিআর, ডিপিএস, লকার, সঞ্চয়পত্র ও লোন বা অন্য কোনো হিসাব থাকলে তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অভিযুক্ত ১২ জনের হিসাব খোলার তারিখ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত যাবতীয় তথ্য দিতে বলা হয়েছে।

যাদের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে তারা হলেন টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাফর আহমেদের ছেলে সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া ও তার ভাই দিদার মিয়া, সাবরাং ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান নূর হোসেন, একই ইউপির বেইঙ্গাপাড়া গ্রামের সৈয়দ আহমেদের ছেলে মোয়াজ্জেম হোসেন, আলীর ডেইলের নজির আহাম্মদের ছেলে আক্তার কামাল ও শাহেদ কামাল, পূর্ব সাতঘরিয়াপাড়ার আবুল বশরের ছেলে রাকিব আহম্মদ, শিলবনীয়াপাড়ার হায়দার আলীর ছেলে কামরুল হাসান রাসেল, মোচনপাড়ার সৈয়দ হোসাইনের ছেলে মোহাম্মদ আলী, নতুন পল্লানপাড়ার বশির আহমেদের ছেলে আজিম উল্লাহ, বালুখালী গ্রামের হোসাইন আলীর ছেলে ফাজল কাদের ভুট্টু ও বালুখালীর বক্তার আহাম্মদের ছেলে আবদুল মজিদ।

দুদকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, কক্সবাজারের ৫৮ জন মাদক কারবারির অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান চলমান আছে। প্রথম পর্যায়ে ১২ জনের তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে আরও তিনজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই ১৫ জনের অনুসন্ধান শেষপর্যায়ে রয়েছে। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত তথ্যের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করে শিগগিরই কমিশনে দাখিল করা হবে। ওই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে কমিশন পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।

জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টেকনাফে ২০১৩ সালে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করলে মাদক কারবারিরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। এলাকার মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে অনেকের বাড়িতে হামলা চালায়। মাদক কারবার করে সম্পদের মালিক হওয়া ব্যক্তিদের ধরতে ২০১৭ সালের ১৩ জুন মাঠে নামে দুদক। দুদক ওই সময়ে কক্সবাজারের মাদক কারবারিদের তালিকা চেয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে চিঠি দেয়। এরপর একই বছরের নভেম্বরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ১৪১ জনের একটি তালিকা দুদকে তালিকা পাঠানো হয়। ওই তালিকা পর্যালোচনা করে জেলাওয়ারি কাজ শুরু করে দুদক। এর মধ্যে টেকনাফের ৫৮ জনের অবৈধ সম্পদের খোঁজে নামে সংস্থাটি।

দুদকের টেবিলে থাকা অভিযোগে বলা হয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় ৯ নম্বরে ছিলেন টেকনাফ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া। আর ৬ নম্বরে ছিলেন তার বাবা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমেদ। ২০১৯ সালে ২৮ জুলাই রাতে শাহজাহান চেয়ারম্যানের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার ইয়াবা ও ২৫ রাউন্ড গুলিসহ চারটি দেশীয় অস্ত্র (এলজি) উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাকে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মাদক কারবার করে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য মিলেছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, একই তালিকায় আছেন সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান নূর হোসেন। তালিকায় আছেন তার ভাই সৈয়দ হোসেনও। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ২০২০ সালের ১৫ জুন টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউপি চেয়ারম্যানের নূর হোসেনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৪০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নূর হোসেন এবং তার সহযোগী হাফেজ উল্লাহ ও লালাসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

ওই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় ৩৭টি ইয়াবা তৈরির আস্তানা গড়ে উঠেছে। সেখানকার ১০ ডিলার প্রতিদিন বাংলাদেশে ৩০ লাখ ইয়াবা পৌঁছে দেয় টেকনাফের ইয়াবা কারবারিদের কাছে। এরপর এসব ইয়াবা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ইয়াবা চোরাচালানির মাধ্যমে টেকনাফের রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধিরা বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন।