পুতিনের জয়ে পুনর্বিন্যস্ত হতে পারে বিশ্বব্যবস্থা

আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি। ২০২২ সালের এই দিনে প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালিয়ে ইউরোপের মাটিতে একটি নতুন যুদ্ধের সূচনা করে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ভগ্নস্তূপে গড়ে ওঠা দেশ রাশিয়া। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ছায়াতলে থাকা ভূখন্ড ইউক্রেনের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের মিত্রতাকে হুমকি মনে করে আগ্রাসন শুরু করেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। রুশ বাহিনী এখন ইউক্রেনের ২০ শতাংশের মতো ভূখন্ড দখলে নিয়েছে। ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল লুহানস্ক, দোনেৎস্ক, জাপরিঝিপিয়া ও খেরসনকে মস্কোভুক্ত ভূখন্ডে পরিণত করেছে রাশিয়া। ইউক্রেনের আভদিভকা শহর জয় করে স্থবির যুদ্ধের পালে হাওয়া জোরালো করেছে রুশ সেনারা। এ অবস্থায় বিশ্লেষকরা বলছেন, পুতিন এই যুদ্ধে জয়লাভ করলে, বিশ্ব এমন সব পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করবে যা অভূতপূর্ব।

ইউক্রেনের পক্ষ নিয়ে গোটা পশ্চিমা বিশ্বের আশীর্বাদ সত্ত্বেও যদি ইউক্রেন যুদ্ধে টিকতে না পারে, তাহলে গোটা বিশ্বব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন দেখা যাবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ তৃতীয় বর্ষে পা দিচ্ছে যখন, ঠিক সেই মুহূর্তে ইউক্রেনের সেনারা ক্লান্ত। কিয়েভের হাতে সামরিক রসদ ফুরিয়ে গেছে। ইউক্রেনে গোলাবারুদ সরবরাহ করতে গিয়ে ইউরোপীয় মিত্ররা হিমশিম খাচ্ছে। আবার তিন-চার মাস ধরে মার্কিন রাজনীতির সমীকরণের জটিলতায় পড়ে ইউক্রেনে সহায়তা আসা বন্ধ হয়ে গেছে। ইউরোপীয় মিত্রদের মাঝেও আগের মতো দৃঢ় ঐক্য দেখা যচ্ছে না। আবার এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের মতো অস্ত্র এবং অত্যাধুনিক এমজিএম-১৪০ আর্মি ট্যাকটিক্যাল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা (এডিএসিএমএস) এখনো হাতে পায়নি কিয়েভ। জার্মানি টাউরুস ক্ষেপণাস্ত্র দেবে কি না, তা-ও অনিশ্চিত। আবার মার্কিন নির্বাচনে এ বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে গোটা ইউরোপেই তার ঢেউ বয়ে যাবে। কারণ তিনি এরই মধ্যে ন্যাটো জোট নিয়ে অস্বস্তিকর মন্তব্য করেছেন, যা ইউরোপে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সেই সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলের নজিরবিহীন আগ্রাসনের কারণে পশ্চিমা বিশে^র মুখ পুড়ছে, যা বিশ্ব জনমতকেও পশ্চিমাবিরোধী করে তুলেছে; বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের যে ভূমিকা তা নিয়ে মুসলিম বিশ্ব ক্ষুব্ধ; অর্থাৎ পুতিন যুদ্ধে এমন এক বছরে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন, যেখানে তিনি অনেকগুলো সমীকরণকে কাজে লাগিয়ে নিজের ফায়দা ঘরে তুলতে পারেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পুতিন এবং পুতিনবিরোধীদের জন্য চলতি বছরটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ নিয়ে বেলজিয়ামের সাবেক উপ-প্রতিরক্ষা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মার্ক থাইস বলেন, ‘এ বছর দুই পক্ষের জন্য পুনরুদ্ধার ও নতুন কিছুর প্রস্তুতি পর্ব; যেমনটা দেখা গিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯১৬ সালে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪১-৪২ সালে।’

সত্যিকার অর্থে ইউক্রেন যুদ্ধে হেরে কী হবে, তাই নিয়েও হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে গেছে। পর্যবেক্ষকরা অনেক কিছু বলছেন, যা বিশ্ব মানচিত্রে নতুন ঘটনাই হবে। ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত দেশটির কর্মকর্তারাই। ইউক্রেনের সামরিক বিশ্লেষক তারাস চমুট বলেন, ‘এ বছর খুবই কঠিন হতে যাচ্ছে। কেউ বলতে পারে না, রাশিয়া কোন দিক থেকে আসবে এবং আমরা এ বছর অগ্রসর হব কি না, তা এখন দেখার বিষয়।’

যুদ্ধ শুরুর সময় রাশিয়াকে কোণঠাসা করতে লাগাতার অবরোধ দিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। যুদ্ধের দুই বছর পূর্তি এবং রুশবিরোধী নেতা নাভালনির কারাগারে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গতকাল আরও এক দফা নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ইইউ কর্তৃপক্ষও রাশিয়াকে আটকাতে সম্ভাব্য সবই করছে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রুশ অর্থনীতি ধসে পড়তে পারে বলে যেভাবে পশ্চিমা বিশ্লেষকরা দাবি করছিলেন, বাস্তবে তা হয়নি; বরং সবাইকে অবাক করে দিয়ে রুশ অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির দিকেই যাচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে, রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের মূল্যসীমা বেঁধে দেওয়ার সিদ্ধান্তের অকার্যকারিতা, রুশ বাণিজ্যের নতুন গন্তব্যস্থল তৈরির পাশাপাশি ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোর সঙ্গে পশ্চিমা বিশে^র মতভিন্নতা রাশিয়ার অর্থনীতিকে নাজুক হতে দেয়নি। ইরান ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো রাশিয়ার অস্ত্রের জোগান দিয়ে যাচ্ছে। আবার চীনা অর্থনীতির সঙ্গে রাশিয়ার অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান সংযোগ মস্কোকে পঙ্গুত্বের হাত থেকে রক্ষা করেছে। আবার এশিয়া ও আফ্রিকার ছোট ছোট দেশও পশ্চিমা বিশে^র মতের অনুগামী হয়ে রাশিয়াকে ছুড়ে ফেলে দেয়নি; বরং আফ্রিকার ছোট ছোট দেশে রুশ গ্রহণযোগ্যতা এখন তুঙ্গে।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের মধ্যে গোটা বিশ্বের শক্তির পুনর্বিন্যাস ঘটে গেছে বলে মনে করেন যুক্তরাজ্যভিত্তিক থিংকট্যাক চ্যাথাম হাউজের ‘আফ্রিকা কর্মসূচি’র পরিচালক ড. অ্যালেক্স ভিনেস। তিনি বলেন, ‘এই পরিবর্তন আফ্রিকা জুড়ে বেশি দেখা গেছে। ইউক্রেনে হামলার জন্য রাশিয়ার নিন্দা করে জাতিসংঘে আনা প্রস্তুাবগুলোয় অংশ নেয়নি মহাদেশটির ৫১ শতাংশ দেশ; অথচ স্নায়ুযুদ্ধের আগে এর বিপরীত প্রবণতা দেখা যেত অঞ্চলটিতে।’

ন্যাটো সামরিক জোট ও ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো এরই মধ্যে উদ্বিগ্ন। ন্যাটো জোটে ইউক্রেনকে নিয়ে রাশিয়াকে আরও কোণঠাসা করতে যাওয়ার পশ্চিমা পরিকল্পনা এখন উল্টো দিকে ঘুরেছে। বাল্টিক অঞ্চলসহ পূর্ব ইউরোপের পোল্যান্ড, রুমানিয়ার মতো দেশগুলো রুশ আক্রমণের ভয়ে রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনে পুতিনের জয় তাদের সেই ভীতিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

পশ্চিমা বিশ্বের তাত্ত্বিকরা চিন্তিত ইউক্রেনের পুতিনের জয়ের পরের সম্ভাব্য বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে। নিরাপত্তা, আধিপত্য বিস্তারসহ নানা ইস্যুতে তারা মনে করছেন, ইউক্রেনে পুতিনের জয়ের অর্থ হলো ভারত প্রশান্ত মহাসাগীয় এলাকা, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকা, দক্ষিণ চীন সাগরসহ বিস্তীর্ণ জলসীমায় চীনের প্রভাব বৃদ্ধির ঘটনা আরও জোরালো হবে। তাইওয়ান ইস্যুতেও পশ্চিমা অবস্থান ধাক্কা খাবে।

সম্প্রতি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি নথিতে বলা হয়, ২০২৭ সালে তাইওয়ানকে মূল ভূখন্ডের সঙ্গে একত্রীকরণ করতে পারে চীন। মোটাদাগে ইউক্রেনের মতো পরিণতি যে তাইওয়ান ভোগ করবে না, তার নিশ্চয়তা তখন আর থাকে না। সে ক্ষেত্রে ইউক্রেনে ধাক্কা খাওয়ার পর প্রাচ্যের তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মুখরক্ষা হবে না। আবার কোরীয় উপদ্বীপে দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের মতো এশীয় মিত্ররাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে; কারণ উত্তর কোরিয়ার মতো পরমাণু শক্তিধর সেখানে লাগাতার অস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে; অর্থাৎ ওই ধরনের কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হলে বাস্তবিক অর্থে পশ্চিমাদের অবস্থান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অবস্থায় যাবে।