ইসলাম আমাকে মানবিক কাজে অনুপ্রাণিত করেছে

মোহাম্মদ আল আমিন রহমান। নরসিংদীর একজন ব্যবসায়ী। হাবিব টেক্সটাইল মিলস ও আল আমিন ফেব্রিক্সের পরিচালক। নরসিংদী চেম্বার অব কমার্সের ডিরেক্টর। ব্যবসার পাশাপাশি মানবিক কাজে গড়ে তুলেছেন সামাজিক অনেক সংগঠন। ১৪ বছর ধরে ১৫ হাজার মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন এতিমখানা। কাউকে দিয়েছেন ঘর, কারও বিয়ে। মানবিক কাজের অনুপ্রেরণাসহ নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আশফাক মুহাম্মাদ শাফি

দেশ রূপান্তর : ব্যবসায়ী হলেন কীভাবে?

আল আমিন রহমান : তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। সে সময় থেকে আড়ংয়ের সঙ্গে আব্বার ব্যবসা ছিল। আমিও মাঝেমধ্যে আড়ংয়ে যেতাম। আব্বার অফিসে যেতাম। ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতাম। কাজ দেখতাম, শিখতাম। এভাবে বেশ কিছু জিনিস শিখে ফেলি। একবার ম্যানেজার চলে গেল। দায়িত্ব এলো আমার ওপর। দেখতে দেখতে অনেক কিছু শিখে ফেললাম। এরপর ২০০২ সালে আব্বা ডায়িং দিয়ে বললেন, ‘এই প্রতিষ্ঠান তুমি চালাও। আমি আর চালাব না।’ তখন থেকে পুরোদমে ব্যবসা শুরু করলাম। এখনো ব্যবসায় লেগে আছি। লোকে আমাকে ব্যবসায়ী বলেই চেনে।

দেশ রূপান্তর : ব্যবসার পাশাপাশি মানবিক কাজে সময় বের করেন কীভাবে?

আল আমিন রহমান : ব্যবসায়ীরা খুব ব্যস্ত থাকেন। তাদের জন্য নানামুখী কাজে সময় বের করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তবে ইচ্ছা থাকতে হয়। আমি ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম, মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করব। মানুষের পাশে দাঁড়াব। ছোটবেলা সেটা করতামও। এখন শত ব্যস্ততার মাঝেও মানবতার কাজের জন্য সময় বের করে নিই। মানুষের পাশে দাঁড়াতে না পারলে আমার ভেতর এক ধরনের অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। যতদিন বেঁচে থাকব, মানুষের জন্য কাজ করে যাব।

দেশ রূপান্তর : মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা কোথায় পেলেন?

আল আমিন রহমান : ইসলামে মানুষকে সহযোগিতার ব্যাপারে বেশ জোর দেওয়া হয়েছে। নিকটাত্মীয়, দূরের আত্মীয়, প্রতিবেশী এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে ইবাদত বলেছে। ইসলামের এই নির্দেশনা আমাকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে। ছেলেবেলায় মাকে দেখতাম, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীকে সাহায্য করছে। বিপদে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। তার কাছে অনেক মানুষ আসত, কাউকে খালি হাতে বিদায় দিতেন না। মায়ের এ কাজগুলো আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। মা আমার প্রেরণার বাতিঘর।

দেশ রূপান্তর : মানবিক কাজ করতে আপনার কেমন লাগে?

আল আমিন রহমান : সত্যি বলতে, দেওয়ার মাঝেই শান্তি। কাউকে কোনো কিছু দেওয়ার পর, তার প্রয়োজন যদি পূরণ হয়, সে যদি হাসে, সে যে আনন্দ পায়, এটা দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। গর্ববোধ করি। অনেকে তো, মাথায় হাত দিয়ে এমনভাবে দোয়া করে, চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। আমি তো হাজারও মানুষকে সহযোগিতা করেছি এবং করছি। এর মধ্যে কাউকে কাউকে কয়েক লাখ টাকাও দিয়েছি। কারও বড় চিকিৎসা করেছি। কারও মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। কারও মেয়ের জন্য ঘরভর্তি ফার্নিচারের ব্যবস্থা করেছি। এতিমখানা করেছি। ১৪ বছর ধরে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়ে আসছি।

দেশ রূপান্তর : এসব কাজের ক্ষেত্রে ইসলামের কোন বিষয়টি আপনাকে সহযোগিতা করে?

আল আমিন রহমান : দেখুন, আমি খুব বড় ব্যবসায়ী নই। আমার খুব বেশি টাকাও নেই। যা আছে, এর মধ্যে আমি মানুষকে নিয়ে বাঁচতে চাই। মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। ইসলাম মানুষকে দান-সদকার নির্দেশ দিয়েছে। অসহায়-দরিদ্র সাহায্যের জন্য এলে, তার পাশে দাঁড়াতে বলা হয়েছে। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করি। আমার কাছে এলাকার, আমার ফ্যাক্টরির ও দূরের মানুষ আসে, আমি কাউকে ফিরিয়ে দিই না কখনো। কিছুটা হলেও দেওয়ার চেষ্টা করি।

দেশ রূপান্তর : ব্যবসায়ীরা মানবিক কাজে কীভাবে এগিয়ে আসবে।

আল আমিন রহমান : ব্যবসায় সফল হতে হলে ধৈর্যের সঙ্গে লেগে থাকতে হবে। অনেক পরিশ্রম করতে হবে। আমি নিজেও অনেক পরিশ্রম করেছি। পরিশ্রম আর আল্লাহর করুণায় আমি এতদূর এলাম। আল্লাহর কাছে লাখো শুকরিয়া। আমি মনে করি, প্রতিটি ব্যবসায়ীর ব্যবসার পাশাপাশি সময় বের করে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো। এতিমদের সহযোগিতা করা। মৃত্যুর সময় তো মানুষের সঙ্গে কিছুই যাবে না, সাদা কাপড় ছাড়া। সুতরাং মানবিক কাজে এগিয়ে আসা দরকার। এর মধ্যে যে প্রশান্তি আসে, অন্য কিছুতে নেই। ব্যবসার পাশাপাশি এগুলো করলে আল্লাহ বরকত দেবেন। ব্যবসায় সফলতা দেবেন। আল্লাহ তো বলেছেন, তোমরা আমার কাছে চাও, আমি দেব।

দেশ রূপান্তর : তরুণ আলেম ব্যবসা করতে চান, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

আল আমিন রহমান : হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে ব্যবসা করেছেন। তিনি ব্যবসা প্রাধান্য দিয়েছেন। তার মতো সেরা মানুষ পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই। তিনি নিজেই বলেছেন, তোমরা ব্যবসা করো। তিনি ব্যবসা পছন্দ করতেন। যারা আলেম আছেন, যারা মাদ্রাসায় পড়ান, তাদের অবশ্যই ব্যবসায় আসা দরকার। তারা ব্যবসায় এলে সততার সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবেন। অন্যরা তাদের থেকে শিখবেন। তারা ব্যবসায়ী সমাজ বদলাতে পারবেন। তাদের ব্যাপারে মানুষের অর্থনৈতিক ধারণা পাল্টে যাবে।

দেশ রূপান্তর : বর্তমান পরিস্থিতিতে সততার সঙ্গে ব্যবসা করে কী ভালো করা যাবে?

আল আমিন রহমান : সততা না থাকলে ব্যবসা এগোয় না। সততা না থাকলে ব্যবসা টিকবে না। যারা ব্যবসায় মিথ্যা বলে, তারা খুব বেশি এগোতে পারে না। একটা সময় ধরা পড়ে যায়। সততার সঙ্গে ব্যবসা করলে বিক্রি বাড়ে। আমি মনে করি, সততার সঙ্গে ব্যবসায় লাভ অল্প হলেও সে বুকটান দিয়ে ব্যবসায়ী মহলে কথা বলতে পারবে। মানুষের সঙ্গে বুক উঁচু করে চলতে পারবে। আল্লাহ তার প্রতি খুশি হবেন।