সাইবার নিরাপত্তা আইনের পাঁচটি ধারা সাংবাদিকদের বিপদে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ। গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিতে এক কর্মশালায় তিনি এ কথা বলেন।
‘সাইবার নিরাপত্তা আইন ও আইন সাংবাদিকতা’ শীর্ষক এ কর্মশালার আয়োজন করে ল রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ)।
বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ বলেন, ‘সাইবার নিরাপত্তা আইনের পাঁচটি ধারা সাংবাদিকতায় মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এগুলো হলো ধারা ২২, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৮।’
তিনি বলেন, ‘প্রথমটা ধারা ২২, ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক জালিয়াতি। সংজ্ঞায়িত করেন জালিয়াতিকে কোন কাজ করলে জালিয়াতি হবে, কোন কাজ করলে জালিয়াতি হবে না। যদি সংজ্ঞায়িত না করেন, তাহলে একেক সময় একেক সরকার আসবে একেক ভিউ নিয়ে। মন্ত্রীদের একেকজনের মাইন্ড সেট একেক রকম হবে। অনেকের ইনটলারেন্স থাকে প্রচন্ড। এ ছাড়া, আমাদের পলিটিক্যাল এনভায়রনমেন্টও ইনটলারেন্সের।’
বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ বলেন, ‘১৯৯১ সাল থেকে দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রচন্ড ইনটলারেন্স আমরা দেখেছি। কোনো ধরনের সমালোচনা হলেই গ্রেপ্তার-নির্যাতন ছাড়া আর কোনো পন্থা উনাদের হাতে আছে বলে মনে করেন না। এ ক্ষেত্রে বিরোধী রাজনৈতিক দলকে দমন করতে গিয়ে দেখা যায় সাংবাদিকরাও এর ভিকটিম হয়ে যেতে পারেন। টার্গেট করা হয় যে, সাংবাদিকরা ওই রাজনৈতিক দলের প্রতি দুর্বল।’
সাইবার নিরাপত্তা আইনের ২৯ ধারার উল্লেখ করে এই বিচারপতি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়ে থাকে যে, এই আইনটা সাংবাদিকবান্ধব আইন বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষের আইন। এটা বলতে গিয়ে বারবার সরকারের পক্ষ থেকে ২৯ ধারার মানহানির কথা বলা হয়। আগে মানহানির জন্য জেলে পাঠানো যেত। এখন জরিমানার বিধান করা হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে বা অনেকেই বলেছেন, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারও বলেছে যে, ধারা ২২, ২৩, ২৫, ২৭, ২৮ আপনাকে বিপদে ফেলতে পারে।’
এর আগে কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে গণমাধ্যমেরও ভূমিকা আছে। তিনি বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের যে নিউজগুলো হয়, সবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলব, অনেক সময় মিডিয়ার কারণেও কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। বিশেষ করে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে, সকাল ৮টায় কোনো চ্যানেলে যদি বলে, খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের সংকট, তাহলে সকাল ১০টায় কারওয়ান বাজারে ৩০ ভাগ দাম বেড়ে যায়। বিকেলে শ্যামবাজারে ৪০ শতাংশ বেড়ে গেল। একটা হাহাকার শুরু হয়ে যায়। ৮টা, ১০টা টেলিভিশন যদি সারা দিন প্রচার করে ছোলার সংকট, পেঁয়াজের সংকট, রোজা আসছে সয়াবিন তেল নেই, স্টক করা শুরু হয়ে যায়, মানুষও ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেখানে দুই কেজি কিনলেই হয়, সেখানে ১০ কেজি কিনতে চায়, চাহিদা বেড়ে যায়। এই যে নিউজগুলো হয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ব্যাপারে, এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত যে, এখানে কিন্তু আমাদের দেশের মিডিয়া পজিটিভ রুল প্লে করেন না।’
বিচার বিভাগ ও বিচারকদের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়ে এই বিচারপতি বলেন, ‘যতটুকু সত্য ঘটনা ততটুকু প্রকাশ করা উচিত। আমরা কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নই। সে বিচারক হই, যেই হই। আমাদের জবাবদিহি আছে জনগণ, আইন ও সংবিধানের কাছে। সুতরাং আমাদের অ্যাকাউন্টিবিলিটি থাকতে হবে। সে বিষয়ে আপনারা যদি নিউজ করতে চান করতে পারেন। তবে আমি মনে করি এ ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। বিচারক যাতে মানহানির পর্যায়ে না যায়।’
কর্মশালায় আরও বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি শামীমা আক্তার। সঞ্চালনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিবুর রহমান।