তিন ফসলি জমি নিয়ে কৃষক-কোম্পানি দ্বন্দ্ব

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় বেসরকারি উদ্যোগে ৫০ মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। কৃষকরা বলছেন, ল্যান্ডকো নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের নাম করে এই এলাকার তিন ফসলি জমিতে চাষ করা আবাদ ভেঙে জোর করে জমি দখল করছে। এতে তারা অনেক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ২০১৭ সালের পর থেকে তারা ২৭৬ একর জমি কিনলেও দখল পেয়েছে মাত্র ৫০ একর। বাকি জমির দখল নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। তিন সপ্তাহ আগেও তারা জমি দখল নিতে গেলে তীব্র রূপ নেয় বিরোধ। ঘটনায় উপজেলা ভূমি কর্মকর্তাকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও করা হয়েছে। তবে এখনো সেই কমিটি কোনো প্রতিবেদন দেয়নি।

সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, তিন ফসলি এসব জমিতে গম, ভুট্টা, মরিচ, বাদাম, ধান, পেঁয়াজসহ নানা ধরনের আবাদ রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর এসব জমি থেকে কয়েক হাজার টন ফসল উৎপাদন হয়। এ ছাড়া বর্ষাকালে কয়েক হাজার টন দেশি মাছ উৎপাদিত হয়। গত ৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে তিনটি ট্রাক্টর ও ২০০-২৫০ ভাড়াটে লোকজন নিয়ে এসব জমি দখলে নিতে আসে প্রতিষ্ঠানটির লোকজন। এ সময় বাগ্বিত-া শুরু হলে একপর্যায়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, তেঁতুলিয়া মডেল থানা-পুলিশ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাহবুবুল হাসানকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন। কমিটির অন্য দুইজন সদস্য হলেন উপজেলা সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার, কৃষি কর্মকর্তা। কিন্তু গত ২০ দিনেও তদন্ত শেষ হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ক্ষতিপূরণের আশায় দপ্তরে দপ্তরে ঘুরছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির কাছে অনেক আগেই জমি বিক্রির পর তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে তারা সেই জমি বাদ দিয়ে অন্য ফসলি জমি দখল করার চেষ্টা করছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিনিধিরা বলছে, স্থানীয় দালাল চক্রের মাধ্যমে জমি দাতারা ভুয়া খারিজসহ প্রতারণায় একাধিকবার জমি বিক্রি করে প্রাপ্ত জমি আটকে দিয়েছে। তাদের নানা কৌশলে অনিয়ম ও প্রতারণার শিকার হয়েছেন তারা। এতে ৩ বছরের প্রজেক্ট শেষ হচ্ছে না ৬ বছরেও। অভিযোগের বিষয়ে আবারও স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি অস্বীকার করেন তারা। স্থানীয় কৃষক মোস্তফা কামাল বলেন, প্রতিষ্ঠানটি যদি কারও জমি কিনে থাকে তাহলে তারা দখল করবে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তারা গণহারে কেন জমি দখল করবে। কেউ জমি বিক্রি না করলেও মানুষের ফসলের ওপর ট্রাক্টর চালিয়ে জমি দখল করছে। গত কয়েক দিন আগেও তারা আমাদের গমসহ নানা ফসলের আবাদ নষ্ট করেছে।

তবে প্রতিষ্ঠানটির স্থানীয় প্রতিনিধি জহিরুল ইসলাম জহির বলেন, আমরা প্রথমে আমাদের ২৭৬ একর জমি দখলে নিয়ে সীমানা ঘেরা দিতে চাচ্ছি। তবে এর মধ্যে যদি কারও জমি পড়ে থাকে তাহলে তাকে আমরা প্রথমে বিক্রি করতে অনুরোধ করছি। নতুবা তাকে আমরা অন্যত্র জমি বদল দেব। তবে অনেকে ভুয়া দাতা সেজে জমির মালিকানা দাবি করছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন মহলের ইন্ধনে তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টাও করছে।

তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে রাব্বি বলেন, ঘটনায় সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে সেটেলম্যান্ট অফিসার, কৃষি অফিসারকে সদস্য করা হয়েছে। কমিটি জমির মালিকানা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে রিপোর্ট দিলেই পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই সময়টিতে উভয়পক্ষকে নালিশি জমিতে না যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে।