নতুন আতঙ্ক ‘ডেভিড ইমন’

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩০ এএম

সুদর্শন যুবক, চলাফেরায় আভিজাত্যের ছোঁয়া, যেন হিন্দি ছবির নায়ক; কখনো বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে, কখনো পাঁচতারকা হোটেলের লবিতে হাঁটাহাঁটি করেন; হাতে দামি ঘড়ি, তার ফেসবুক ওয়ালে অসংখ্য ছবি ও ভিডিও; তার ফলোয়ারও আছে লাখের ওপরে নাম তার মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন।

ডেভিড ইমন এখন চট্টগ্রামের অপরাধজগতের ‘সেনসেশন’। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে শীর্ষস্থানীয় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলিবর্ষণ, সর্বশেষ ১৩ জুলাই ২ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিডিএন’-এ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় উঠে এসেছে তার নাম।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য : ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অপরাধজগতে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী এই ইমন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদা দাবি এবং হামলার অভিযোগের পর তাকে নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম নগরে আধিপত্য ধরে রাখতে তিনি দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছেন তার প্রতিপক্ষ সারোয়ার হোসেন বাবলা ও ঢাকাইয়া আকবর নামে পুলিশের তালিকাভুক্ত দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে।

সর্বশেষ ডেভিড ইমনের নাম আলোচনায় আসে ১৩ জুলাই বাকলিয়া এক্সেস রোডে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিডিএন’-এ হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায়। গত শনিবার রাতে চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে ওই ঘটনার মূল সমন্বয়কারী রোহেনসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৭। এর আগে একই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গত শনিবার ৯ জনকে গ্রেপ্তারের পর রবিবার দুপুরে নগরের চান্দগাঁও ক্যাম্পে সংবাদ সম্মেলন করেছে র‌্যাব-৭। সে সময় র‌্যাবের কর্মকর্তারা জানান, ২ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয় ‘সন্ত্রাসী’ মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের নির্দেশে। হামলা-ভাঙচুরে নেতৃত্ব দেন ইমনের সহযোগী রোহেন মিয়া। রোহেনের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা তিন ভাগে ভাগ হয়ে ওই প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়।

র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘সন্ত্রাসী ইমন প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে ফোন করে এককালীন ২ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। এ ছাড়া মাসিক ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা চায়। টাকা না পেয়ে ফোন করার দুই দিনের মাথায় (১৩ জুলাই) হামলা-ভাঙচুর করে ও ৩৫ লাখ টাকা লুটে নিয়ে যায়। গ্রেপ্তারকৃত ৯ জনের মধ্যে ৪ জনকে ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্যদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার করা আসামিদের চকবাজার থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।’

ডিডিএনে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনার দুই দিন আগে ডেভিড ইমনের একটি অডিও কল রেকর্ড ফেসবুকে ভাইরাল হয়। অডিও কলে তাকে (ইমন) বলতে শোনা যায়, ‘আমাকে না চিনলে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেন, বড় সাজ্জাদ বাহিনীর ডেভিড ইমন ফোন করেছে বলেন, আমার ফোন নম্বর দেখান, তিনিই বলে দেবেন আমি কে... ব্যবসা করতে চাইলে একবারে ২ কোটি টাকা ও প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে দেবেন। না হলে দুই দিনের মধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে নেবেন, আমার পোলাপান ব্যবসা করবে।’

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী জানান, ‘বাকলিয়ায় ইন্টারনেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় ডেভিড ইমনসহ জড়িত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করার অভিযান অব্যাহত আছে।’

ডিডিএনের মালিক আদিল বিন মামুন অভিযোগ করেন, হামলার দুই দিন আগে বিদেশি একটি নম্বর থেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয়ে এক ব্যক্তি তাকে ফোন করে এককালীন ২  কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। ওই ব্যক্তি বলে, ‘ব্যবসা করতে হলে এককালীন ২ কোটি টাকা দিবি, মাসে দিবি ১০ লাখ। এখন থেকে ব্যবসা আমরা করব।’ আদিল বিন মামুনের বক্তব্য, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণেই তাদের প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ফোনে হুমকিদাতা ব্যক্তি সবার পরিচিত।’

পুলিশ জানায়, ডিডিএনের কাছে চাঁদা দাবি করে ফোন দেওয়া ‘ডেভিড ইমন’ পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের পক্ষে চট্টগ্রামের অপরাধজগৎ পরিচালনায় নেতৃত্ব দানকারী দুই প্রধান ‘সন্ত্রাসীর’ একজন; তার নাম মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত